মঙ্গলবার, অক্টোবর 27, 2020

পাহাড়ি ঝরনা, মেঘের লুকোচুরি, প্রকৃতির কোলেই 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম'
পাহাড়ি ঝরনা, মেঘের লুকোচুরি, প্রকৃতির কোলেই  'ওয়ার্ক ফ্রম হোম'

পাহাড়ি ঝরনা, মেঘের লুকোচুরি, প্রকৃতির কোলেই 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম'

  • scoopypost.com - Jul 26, 2020
  • প্যাচপ্যাচে গরম, প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে একই ঘর-বারান্দা, তারওপর খবরে চোখ রাখলেই আতঙ্ক, ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। গত চার মাসে ভীষণভাবে হাঁপিয়ে উঠেছেন কি!বাড়িতে বসেই কাজ, নো পার্টি, সিনেমা, আউটিং, বিরক্তিকর!

    এবার ভাবুন তো আপনি ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছেন কিন্তু পাশেই ঝরনার শব্দ। সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে মেঘ। পাশে রাখা গরম কফি আর স্যান্ডউইচ। একটু দূরে আপনার চার বছরের মেয়েটা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। আপনার স্ত্রী নরম আলতো রোদে ম্যাগাজিন পড়ছেন। কি ভীষণ ফিরে পেতে ইচ্ছে করছে না এমন দিনগুলো, পুরনো বেড়ানোর সময়গুলো।

    লকডাউন, করোনা আমাদের পরিবেশ, পরিস্থিতি পালটে দিয়েছে। একইসঙ্গে বুঝিয়েও দিয়েছে নতুন নিয়মে জীবন চালাতে হবে। আর তাই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের বদলে ওয়ার্ক ফ্রম ডেস্টিনেশন।বহু কোম্পানি এখন জানিয়ে দিয়েছে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্ত ওয়ার্ক ফ্রম হোমই তারা করাবে। তাছাড়া বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে কিছু কোম্পানি পাকাপাকিভাবে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের কথাও ভাবছে। কারণ, এতে অফিস ভাড়া নেওয়া, টেকনিক্যাল সেটআপ, মোটা অংকের বিদ্যুত বিলও বাঁচছে।

    কিন্তু দিনের পর দিন ঘরবন্দি হয়ে সকলেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না। খেলার মাঠের ছোটাছুটিতেও দাঁড়ি পড়েছে। আঁকা, নাচ, গান, সাঁতারের ক্লাস সমস্তই বন্ধ। মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে তাদের। চার দেওয়ালে আটকা পড়ে দাম্পত্যও হাঁফিয়ে উঠেছে।এই পরিস্থিতির কিন্তু অন্য সমাধান আছে।আর সেটা সম্ভব পড়াশোনা থেকে কাজ সমস্তটাই ওয়ার্ক ফ্রম হোম হওয়ার ফলে।

    আগেকার দিনে যেমন স্বাস্থ্য ফেরাতে লোকে মধুপুর, শিমুলতলা, গিরিডিতে গিয়ে থাকতেন এই কনসেপ্টটাও তেমনই। তবে শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়েও মানসিক স্বাস্থ্য ফেরাতে এটা বেশি উপযোগী। করোনা আবহে পর্যটন শিল্প প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন। হোটেল ব্যাবসা শিকেয়। হোম-স্টের ব্যবসাতেও আয় হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে লকডাউন শর্ত সাপেক্ষে শিথিল হতে হোম-স্টে ব্যবসায়ী, হোটেল মালিকরা অন্য ভাবনা ভাবতে শুরু করেছেন।তাঁরা হোম স্টের ঘর মাসিক বা ১৫ দিন ভাড়ার শর্তে দিতে চাইছেন। কেউ যদি পরিবার নিয়ে এসে থাকতে চায় থাকুক। প্রকৃতির কোলের ছোট্ট বাড়িতে কোনও পরিবার একেবারেই নিজের মতো করে থাকতে পারবে। ল্যাপটপ নিয়ে কাজের অসুবিধেও হবে না। নিজেরা রান্না করে যাতে খেতে পারেন সেই ব্যবস্থাও থাকছে। অনেকটা আগেরকার দিনের হলিডে-হোমের মতো।

    লকডাউন শিথিল হতেই উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশ পর্যটকদের জন্য শর্তসাপেক্ষে খুলে দেওয়া হয়েছে।আর তারপর থেকেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ওয়ার্ক ফ্রম ডেস্টিনেশন কনসেপ্ট।উত্তরাখণ্ডের মুক্তেশ্বর, ছবির মতো সাজানো পাহাড়ি গ্রাম। সেখানেই প্রবীণ নাগপালের নিজস্ব রিসর্ট আছে। ছ’টি কটেজ।জানালেন, বর্তমান পরিস্থিতি করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট থাকলে যে কোনও পর্যটক বেড়াতে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁদের প্রকৃতির কোলে পনেরো দিন, মাস খানেক কাটিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ প্যাকেজ দেওয়া হচ্ছে। এখন অনেকেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন। তাই হাইস্পিড ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, ওয়াইফাই-এর ব্যবস্থার পাশাপাশি তাঁরা পর্যটকদের জন্য আলাদা রান্নাঘর, রান্নার সরঞ্জামের ব্যবস্থাও রাখছেন। যাতে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং-ও থাকে আবার প্রকৃতির সান্নিধ্যে কেউ পরিবার নিয়ে দিন কাটাতে চাইলে সেটাও হয়।আর বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যটন যেভাবে মার খেয়েছে তাতে মাসিক ভিত্তিতে ঘর ভাড়ার বিনিময়ে স্থায়ী আয় চাইছেন ব্যবসায়ীরাও।

    ইতোমধ্যেই এই ধরনের প্যাকেজ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। শুধু মুক্তেশ্বর নয় হিমাচলপ্রদেশে সোলাং-এও গেস্টহাউজ রয়েছে নাগপালের। সেখানে থাকার জন্যও কথা বলতে চাইছেন অনেকে। তিনি জানালেন, দিল্লি, গুরুগ্রাম, নয়ডা, চণ্ডীগড় থেকে লোকজন বুকিং-এর রেট, সুযোগ-সুবিধা জানতে চেয়ে ফোন করছেন।

    ফোন আসছে কর্পোরেট সংস্থার তরফেও। সেখান থেকে বলা হচ্ছে তারা ১৫ জন কর্মীকে পরিবার-সহ পাঠাতে চায়। ঘরের বন্দোবস্ত হবে কি, ভাড়া সস্তায় মিলবে কি না!

    ধরমবীর সিং নামে এক ব্যবসায়ী মানালি, ডালহৌসি, ম্যাকলয়েডগঞ্জ, ঋষিখোলা, মুক্তেশ্বর-সহ বিভিন্ন জায়গায় হোটেল, রিসর্ট, গেস্ট হাউজ মিলিয়ে আটখানা সম্পত্তি রয়েছে। জানালেন, ১৫, ২১, ৩০ দিনের প্যাকেজ দিচ্ছেন। আর তাতে দুই সপ্তাহে যথেষ্ট সাড়া পাচ্ছেন। প্রচুর লোক ফোন করছেন।

    দিল্লির ডেটা অ্যানালিসিস্ট গৌতম মিশ্র জানালেন, আগামী সপ্তাহেই তিনি বিনসর যাচ্ছেন পরিবার নিয়ে। বুকিং সেরে রেখেছেন মাস খানেকের জন্য। নিয়ম মাফিক আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে করোনা টেস্ট করাতে হবে। রিপোর্ট নেগেটিভ হলে আর অন্য রাজ্যে গেলে ১৪ দিনের কোয়ারান্টাইনের শর্ত পূরণ ইচ্ছুক হলেই বেড়ানোতে বাধা নেই। তেমনটাই করবেন। তাঁর স্ত্রীর ওয়ার্ক ফ্রম হোমের সুযোগ রয়েছে। মেয়েরও স্কুল এখন অনলাইনে। তাই প্রকৃতির কোলে নিজেরা সময় কাটাবেন সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেনে।

    শুধু উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল নয়, দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াংয়ের বিভিন্ন জায়গায় হোম-স্টেতে ইন্টারনেট সার্ভিস মিলবে কিনা, ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করা যাবে কি না জানতে চেয়ে জনপ্রিয় ট্র্যাভেল গ্রপগুলোতে প্রশ্নও আসছে। তার মানে এটাই, মানুষ মুক্তির নিঃশ্বাস নিতে পাহাড়ি হোম স্টেতে গিয়ে থাকতে চাইছেন।

    পর্যটন ব্যবসায়ীদের একাংশ জানাচ্ছেন, তাঁরা এক, দু’দিনের বদলে অন্তত কেউ ১০ দিনের জন্য ঘর ভাড়া নিক সেটাই চাইছেন। যত ঘন ঘন একাধিক পর্যটক এলে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়বে। কিন্তু একজন পর্যটক পরিবার নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে এসে অনেকদিন থাকলে সংক্রমণের সম্ভনা দু’তরফেই কমবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যটনও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।তবে এ জন্য পাহাড় বা সমুদ্র বা জঙ্গল যে কোনও জায়গায় ইন্টারনেট সার্ভিস উন্নত করা, ওয়ারফাই পরিষেবা, নিজস্ব কিচেনের বন্দোবস্ত করা জরুরি।