মঙ্গলবার, অক্টোবর 27, 2020

জলিবয় যাননি, বিগ মিস!!!
জলিবয় যাননি, বিগ মিস!!!

জলিবয় যাননি, বিগ মিস!!!

  • scoopypost.com - Feb 16, 2020
  • কাচের চেয়েও স্বচ্ছ্ব জল। নীচে রং-বেরংয়ের কোরাল। তার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে হলুদ, কমলা, গোল্ডেন মাছ। হঠাৎই গাইড বললেন, ওই দেখুন ফাইন্ডিং নিমো সিনেমার নিমো ফিশ। তার পাশেই ঝিনুকের নড়াচড়া। কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে ডিয়ার ফিশ। জলের নীচে এমন জগৎ দেখে মনে হচ্ছিল চোখের সামনেই ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল দেখছি।

    সি অ্যানিমোনসে ক্লাউন ফিশ (নিমো)

    দ্বীপাঞ্চল আন্দামানের অন্যতম আকর্ষণ জলিবয়। ছোট্ট দ্বীপ। আর তার চারপাশে দূষণমুক্ত পরিবেশে বেড়ে চলেছে কোরাল। সমুদ্র শসা, শাঁখ, ঝিনুক, মাছ রয়েছে হরেক প্রাণী। পোর্টব্লেয়ারের কাছেই মহাত্মা গান্ধি মেরিন ন্যাশনাল পার্ক। তারই মধ্যে একটি এই দ্বীপ। হলফ করে বলা যায়, আন্দামান গিয়ে জলিবয় না দেখা জীবনের বড় একটা মিস।

    ওয়ানডুর জেটি থেকে বোটে যখন চেপে বসেছিলাম, সমুদ্র তখন খাঁড়ির মতো। দু’পাশে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ক্রমশই চওড়া হচ্ছিল নীল সাগর। ম্যানগ্রোভ শেষ হতেই দৃশ্যমান হল চারপাশে ছোট ছোট দ্বীপ। ঘন সবুজ। ভোরের সূর্যরশ্মি তখন পড়তে শুরু করেছে দ্বীপের বড় বড় গাছের মাথায়। ঘুম ভাঙছে পাখিদের। কখনও বোটের ইঞ্জিন থামলে শোনা যাচ্ছিল পাখির কলকাকলি। দূরের গাছগুলোতে তাদের ওড়াওড়ি ধরা পড়ছিল খালি চোখে।

    মেঘলা আকাশে জলিবয় অন্যরকম

    মহাত্মা গান্ধি মেরিন ন্যাশনাল পার্কে ইতস্তত ছড়ানো ছেটানো ২০টিরও বেশি দ্বীপ ও বনাঞ্চল সংরক্ষিত। যাওয়ার অনুমতি নেই যাত্রীদের। পর্যটকদের জন্য খোলা শুধু দুটি দ্বীপই। জলিবয় ও রেডস্কিন। এই দ্বীপেও চাইলেই যাওয়া যায় না। দরকার হয় বনদফতরের অনুমতি।

    খাঁড়িপথ পার করে মিনিট পঁয়ত্রিশের মধ্যেই  দেখা মিলল বিশাল সমুদ্রের। সাদাটে বালুতটের কাছে সমুদ্রের জল হালকা নীলাভ। কোথাও আবার মেঘের ছায়া পড়ে একটু নীলচে।কোথাও সমুদ্র নীল। সমুদ্রের রঙের এমন বৈচিত্র্য এদেশে আর কোথাও সেভাবে দেখা যায় কি না, জানা নেই। বোট আরও খানিক এগোতেই সমুদ্রের মাঝে সবুজ একটা ছোট্ট দ্বীপের দেখা মিলল। দূর থেকে দেখিয়ে গাইড বললেন, ওই যে জলিবয়। গাইড জানালেন, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের পর জলিবয়ের কোরাল বিশ্ববিখ্যাত। জলিবয়ের পাশেই রয়েছে রেডস্কিন। তবে সেখানে যাওয়ার অনুমতি নেই।

    স্নান করা যায় জলিবয়ের এই অংশেই

    কারণ, বছরে ছমাস ১৫ মে থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত খোলা থাকে রেড স্কিন। বাকি ছমাস খোলা জলিবয়। এই সব তথ্য জানতে জানতেই আকাশটা বেশ কালো করে এল। হাওয়ার দাপটে বাড়ল ঢেউ।প্রমাদ গুণলাম আমরাও। কারণ, আবহাওয়া দপ্তর থেকে ঘূর্ণিঝড় পাবুকের সতর্কতা জারি হয়েছে। উত্তাল সমুদ্র। তবে তার চেয়েও বেশি ভয় হচ্ছিল তীরে এসে তরী ডুববে না তো। মানে এতদূর এসে জলিবয়ে নামতে পারব তো। গ্লাসবটম বোটে সাগরের নীচের দেশটা দেখতে পারব তো! তবে প্রকৃতি এত নির্দয় হয়নি।

    মেঘলা আকাশের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করেই আন্দামান সাগরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নোঙর হল লঞ্চ। তারপর কয়েক মিনিট গ্লাস-বটম বোটে যাত্রা। তাতেই গিয়ে ভিড়লাম দ্বীপে। এই ফাঁকে বলে নিই গ্লাসবটম বোট কী? ছোট্ট যন্ত্রচালিত নৌকোর নীচে থাকে স্বচ্ছ কাচ। যার মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের গভীরে ৪০ ফিট পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। জলিবয়ের অন্যতম আকর্ষণ এখানকার কোরাল রিফ বা প্রবাল প্রাচীর। প্রায় ৫০ রকমের জীবন্ত কোরাল ও অসংখ্য প্রজাতির মাছ এখানকার সম্পদ। গ্লাস-বটম বোটের পাশাপাশি স্নরকেলিং করেও দেখা যায় সমুদ্রের তলদেশের প্রাণীদের জীবন। কিন্তু আমাদের কপাল মন্দ। স্নরকেলিং বন্ধ ছিল। তাই গ্লাস-বটম বোটে চেপেই যাওয়া হল কোরাল দেখতে। মাথাপিছু হাজার টাকার প্যাকেজ। ১ ঘণ্টা ধরে কোরাল ও মাছ দেখানো হবে এই বিশেষ বোট বা নৌকোয়।

    ফিঙ্গার কোরালের পাশে বড় বড় ঝিনুক

    তবে তার আগে কোরাল বা প্রবাল কী সেটা জানা দরকার। কোরাল  আসলে, এটা একটা প্রাণী। সমুদ্রের স্বল্প গভীর অংশে যেখানে সুর্যের আলো পৌঁছতে পারে সেখানেই দলবদ্ধভাবে বাস করে এরা। কোরাল মৃত্যুর পর পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। তার ওপর জন্মায় নতুন কোরাল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মৃত কোরাল জমাতে জমতে তৈরি হয় কোরালরিফ বা প্রবাল প্রাচীর।

    কোরালের ওপর খেলা করছে রঙিন মাছেরা... গ্লাস বটম বোট থেকে তোলা

    এবার গ্লাস দিয়ে কী দেখলাম সেটাই বলি। ছোট, বড় নানা রকম প্রবাল। তারওপর ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ খেলা করছে। রয়েছে কত রকমের প্রাণী। একে একে গাইড চেনালেন ডিয়ার ফিস,  মাদার কোরাল, সি-কিউকান্বার বা সমুদ্রশসা। চেনালেন, কোন ঝিনুকে মুক্ত হয়।সে এক আশ্চর্য জগৎ। কাচের মধ্যে দিয়ে ছবি তোলাটা বেশ কঠিন। শুধু মুগ্ধ চোখে দেখতে হয় সমুদ্রের নীচের বিচিত্র এ জগৎ। কোনও মাছের শরীরটা কালো, লেজটা হলুদ কোনওটা আবার হলুদ রংয়ের। তবে, মাছের চেয়ে কোরালের বৈচিত্র্যই বেশি। কোনও কোরাল নীল, আবার কোনওটা হলুদ কোনওটা দেখতে মস্তিষ্কের মতো, তার নাম ব্রেন কোরাল কোনওটা আবার মৌচাকের মতো বিশাল। তাকে বলা হয় হানি কোরাল। মরে পাথর হয়ে যাওয়া কোরালের মধ্যে চোখে পড়ল করাতের মতো দেখতে জিনিস। গাইড বললেন, ঝিনুক। তার মধ্যে যেগুলো বড় ঝিনুক সেগুলোতে মুক্ত হয়। বেশ কয়েকবার চোখে পড়ল ঝিনুকের খোলা, বন্ধ হওয়া।বিস্ময়ে তখন সকলে হতবাক। জলের নীচে কালো পাথরের মতো বেশ কিছু মাঝেমধ্যেই দেখতে পাচ্ছিলাম। গাইড জানালেন, সেগুলো সমুদ্রশসা। এরপর, বেশ কয়েক ধরনের সমুদ্রশসা দেখলাম। সবচেয়ে আনন্দ হয়েছিল 'নিমো মাছ দেখে। না, মাছের নাম নিমো নয়, ক্লাউন ফিশ। অরেঞ্জ ও সাদা শরীর। তার সাদা অংশে কেউ যেন কালো রংয়ের সরু বর্ডার  দিয়েছে। “ফাইন্ডিং নিমো” নামে বিখ্যাত একটি অ্যানিমেশন ছবি আছে এই ক্লাউন ফিশদের নিয়ে। আরও একটা তথ্য জানলাম,  ক্লাউন ফিশ থাকে সি অ্যানিমোনসদের সঙ্গে। এটি একটি সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী। অনেকটা ফুলের মতো। সি অ্যানিমোনসের রঙিন শুঁড়ের মতো অংশই এই মাছের থাকার জায়গা। প্রকৃতির কী অদ্ভুত নিয়ম! ক্লাউন ফিশের গায়ে মিউকাস থাকায় মাছটি সি অ্যানিমোনসের গায়ে আটকায় না।অন্য মাছ কিন্তু ঠিক আটকে যায় সেখানে। পরিবর্তে, ক্লাউন ফিশ সি অ্যানিমানোসকে রক্ষা করে অন্য মাছের হাত থেকে। পাশাপাশি এদের না-খাওয়া খাবার থেকে পুষ্টি হয় সিঅ্যানিমোনসের। এভাবে দুজনে দুজনের সাহায্যে বেঁচে থাকে।

    ছবির মতো সুন্দর জলিবয়

    সমুদ্র রাজ্য ঘুরে ফিরলাম জলিবয়ে। এখানে সমুদ্রের কিছুটা দড়ি দিয়ে ঘেরা। একমাত্র সেখানেই স্নান করার অনুমতি আছে। এমন জল দেখে পর্যটক সমুদ্রে ঝাঁপাবে না, তাই কি হয়! দ্বীপে রয়েছে হোগলা পাতার ছাউনি দেওয়া চেঞ্জ রুম। নেমে পড়লাম সমুদ্রের জলে। এত স্বচ্ছ যে জলের নীচের অংশটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। একদল পর্যটক নিজেরাই স্নরকেলিং-এর জিনিসপত্র, চোখের চশমা এনে সাঁতার কাটছিলেন। তাঁদের একজন জানালেন, আমাদের একজনের পাশে নাকি একটা বড় মাছ অনেকক্ষণ ধরে ঘোরাঘুরি করছে। বিশ্বাস করিনি। কারণ, তেমন কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমাদের অবিশ্বাস দেখে তিনি চশমাটা দিয়ে বললেন, পরুন। তারপর জোরে শ্বাস নিয়ে চেপে রাখুন।

    জলে ডুবে মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে শ্বাস ছাড়ুন। চশমা চোখে ডুব দিতেই আত্মহারা হয়ে গেলাম। এ কী দেখছি।ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা! স্নান করতে গিয়েই জলের নীচে চোখে পড়ল কালো পাথরের মতো একটা কী যেন! গ্লাস বটম বোটে প্রচুর সমুদ্রশসা দেখেছিলাম। সন্দেহ হওয়ায় হালকা করে পা ছোঁওয়াতেই দেখি নরম নরম।

    জলিবয় দ্বীপে পর্যটকের আনাগোনা

    মিহি বালুরাশি স্নানের পর গায়ে লেগে খাকে না। নোনা জলে চটচটে ভাব নেই মোটও। তাই সমুদ্রে স্নান করে আর স্নানেরও দরকার হয় না।

    জরুরি তথ্য

    জলিবয়ে চেঞ্জ রুম থাকলেও স্নানের আলাদা জল নেই। নেই পানীয় জল ও খাবারের ব্যবস্থা। ওয়ানডুর জেটির কাছে বনদপ্তরের অফিস থেকে বোতল, জুটের ব্যাগ ভাড়া পাওয়া যায়। খাবারও নিয়ে আসা যায় দ্বীপে। শর্ত একটাই, কোনওভাবে নোংরা করা যাবে না। জলিবয়ে কয়েক ঘণ্টাই থাকার অনুমতি মেলে। নির্দিষ্ট লঞ্চেই ফিরতে হয় আবার। জলিবয় আসতে  বনদপ্তরের অনুপতি পেতে দরকার হয় সচিত্র পরিচয়পত্র। সেটা আগেই জমা দিতে হয়। খরচ লাগে ৮৫ টাকার মতো। সঙ্গে আসল পরিচয়পত্রও রাখা জরুরি। ওয়ানড়র জেটি থেকে জলিবয় লঞ্চ ভাড়া মাথাপিছু ৮৫০ টাকা।অনুমোদন একদিন আগে থেকে নিয়ে নেওয়াই ভালো। দিনের দিনও ব্যবস্থা হতে পারে। তবে, ভোর থেকেই লম্বা লাইন পড়ে যায়। লঞ্চে আসন সীমিত। আসন ভরে গেলে সেদিন আর যাওয়ার সুযোগ থাকে না। সকাল ৯টা ১৫ নাগাদ ছাড়ে প্রথম লঞ্চ।