মঙ্গলবার, অক্টোবর 27, 2020

কুমায়ুনের কোলে স্মৃতিমাখা মায়াবতী
কুমায়ুনের কোলে স্মৃতিমাখা মায়াবতী

কুমায়ুনের কোলে স্মৃতিমাখা মায়াবতী

  • scoopypost.com - Jul 09, 2020
  • হয়তো ভাবছিলেন বাড়ির গাড়িতেই কাছেপিঠে দিঘার সমুদ্দুরটা দেখে আসবেন। কতদিন বেরনো হয়নি। দীর্ঘদিনের চেনা রাস্তাগুলোই আবার দেখত ইচ্ছে করছে তো? কিন্তু কি গেরো! করোনা সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। আবার লকডাউন।

    হতাশ মনে পুরনো গানের খাতা খুঁজতে গিয়ে সেটা না-পেয়ে, পেয়ে গেলাম আর একটি জিনিস। বরফঘেরা ছবি। তোলা ছবি নয়, উত্তরাখণ্ডের আশ্রমেরই বুকস্টোর থেকে কেনা। লাচুং, লাচেন ছাঙ্গু, বাবা মন্দির, সোলাং ভ্যালি নয়।

    লোহাঘাটে মায়াবতী আশ্রম। প্রথম চিত্র-গ্রীষ্ম, শরতে এমনই থাকে আশ্রম। দ্বিতীয়টা শীতে বরফ ঢাকা আশ্রম।

    বরফঢাকা ছবিটা ছিল অদ্বৈত আশ্রমের। নভেম্বরের শেষে যখন সেই আশ্রমে গিয়েছিলাম, তখন চারদিক ফুলে ভরা। বরফে ঢাকা আশ্রম দেখা হয়নি বলেই কিনেছিলাম সেই ছবিটা। 

    উত্তরাখণ্ডে প্রকৃতির কোলে স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য সেভিয়ার দম্পতির উদ্যোগে তৈরি মায়াবতী আশ্রম। তা ভাবলাম সশরীরে ভ্রমণ না-ই বা হল, মনটা যখন আপনাদেরও ভালো লাগছে না তখন মানসভ্রমণেই ঘুরে আসি পাইনের বন, বিস্তীর্ণ উপত্যকার ধারের নির্জন অদ্বৈত আশ্রমে।

    কুমায়ুন হিমালয়। যেদিকে তাকানো যায় মনভোলানো রূপ। সবুজে ভরা উপত্যকা। ঘন নীল আকাশ। পাইনের, ওকের সারি দেওয়া জঙ্গল। খানিক চুপ করলে গাছের ফাঁক-ফোঁকড়ে দেখা মেলে রঙিন সব পাখির। কী মধুর তাদের ডাক।উত্তরাখণ্ডের এমন এক অপরূপ সুন্দর, নির্জন জায়গাই স্বামীজির স্বপ্নের বেদান্ত চর্চা কেন্দ্র তৈরির জন্য বেছে নিয়েছিলেন তাঁরই শিষ্য সেভিয়ার দম্পতি।

    এই ইচ্ছের পিছনেও ছিল বিবেকানন্দর ভাবনা। ১৮৯৫ সালে ইংল্যান্ডে বিবেকানন্দর সঙ্গে আলাপ ক্যাপটেন জেমস হেনসি সেভিয়ার ও তাঁর স্ত্রী শার্লট এলিজাবেথ সেভিয়ারের। স্বামীজীর প্রবল ব্যক্তিত্ব, আদর্শে উদ্বুদ্ধ দম্পতি হয়ে উঠলেন তাঁর শিষ্য। ১৮৯৬ সালে দম্পতির সঙ্গেই ইউরোপ ভ্রমণের সময় আল্পসের অপরূপ শোভা, সৌন্দর্য দেখে বিবেকানন্দের মনে হয়েছিল ভারতেও যদি পাহাড়ের কোলে, কোনও নির্জন স্থানে এক আশ্রম হতো তাহলে বড় ভালো হত। শান্ত প্রকৃতিও মনে প্রভাব ফেলে। এমন জায়গাই তো বেদান্ত চর্চার জন্য উপযুক্ত হতে পারে।


    সেভিয়ার দম্পতি ও স্বামী বিবেকানন্দ

    স্বামীজি মনের কথা জানতে পেরেই উদ্যোগী হন সেভিয়ার দম্পতি।ভারতে আসেন তাঁরা। উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ায় থাকতে শুরু করেন। আর খুঁজতে থাকেন, এমন কোনও স্থান যা স্বামীজির স্বপ্নের বেদান্ত কেন্দ্র হয়ে উঠবে।১৮৯৮ সালে বিবেকানন্দর সন্ন্যাষী শিষ্য স্বামী স্বরূপানন্দকে সঙ্গে নিয়ে দেবদারু পাইন বনের ধারে একটা জায়গা খুঁজে বের করেন সেভিয়ার দম্পতি।১৮৯৯ সালের ১৯ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় বিবেকানন্দের স্বপ্নের অদ্বৈত আশ্রম, বেদান্ত চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। এই আশ্রমই মায়াবতী আশ্রম নামে পরিচিত। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের।


    উত্তরাখণ্ডের চম্পাবত জেলায় লোহাঘাট শহর কাছেই এই আশ্রম। আধ্যাত্মিকতা, সেবার এক অন্যতম পীঠস্থান।জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পিথোরাগড় থেকে মায়াবতী আশ্রম ৭০ কিলোমিটারের মতো পথ। সেই পথের ধারে রয়েছে দেবদারু, পাইন, ওকের ঘন বন। দিনের বেলাতেও শোনা যায় ঝিঁ-ঝিঁ-আরও কত রকমের পোকামাকড়ের ডাক। এখানেই আশ্রমে পাহাড়ের ওপর রং-বেরঙের ফুল ফুটিয়েছেন রামকৃষ্ণ, স্বামীজির ভাবশিষ্যরা।


    আশ্রমের একফালি জমিতে রঙিন ফুলের সম্ভার

    প্রকৃতির কোলে কাঠের বাংলো। পুরনো সেই আদল বদলানো হয়নি। স্বামীজির ধ্যানকক্ষ ও পড়াশোনার জায়গা এখন পাঠাগার। এখান থেকেই প্রবুদ্ধ ভারত-সহ একাধিক বইয়ের প্রকাশনা হয়েছে। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ-সহ মহারাজদের বেদান্ত-সহ জীবন ভাবনার ওপর বহু বই এখান থেকেও ছাপা হয়েছে। প্রকৃতির নির্জনতা, সৌন্দর্য্যের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে আধ্যাত্মিকতা। তারই সঙ্গে এলাকার আর্থ-সমাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন মহারাজরা। চেষ্টা করছেন মানুষের আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক উন্নয়নের। পরে আশ্রমের একটু নীচেই স্থাপন হয় দাতব্য চিকিত্সালয়ও।


    আশ্রমের দাতব্য হাসপাতাল

    তবে মায়াবতী নামে আশ্রম পরিচিত হওয়ার অনেক আগে এই এলাকাকে ‘মাঈ কি পেঠ’ বলা হত। মানে মায়ের স্থান। জঙ্গলে পড়ে থাকা শিলাখণ্ডকেই দেবতা রূপে পুজো করেন এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে এখনও আদিবাসীরা পুজো দেন।

    আশ্রমের কাছেই রয়েছে চাষের জমি। মহারাজরাই চাষবাস দেখেন। তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সরোবর। ধান, গম, স্ট্রবেরির চাষ হয় এখানে। রয়েছে গোশালাও।


    এখানেই ধ্যান করতেন স্বামী স্বরূপানন্দজি

    এখানেই এক নির্জন জায়গায় ধ্যান করতেন স্বামী স্বরূপানন্দ। শোনা যায়, একদিন তিনি ধ্যান করছিলেন। তারপর চোখ খুলতেই দেখেন সামনেই বাঘ বসে আছে। তিনি ফের চোখ বন্ধ করে জপ, ধ্যান শুরু করেন। তারপর অবশ্য বাঘকে দেখতে পাননি। তবে এই কথা জানার পর এলিজাবেথ সেভিয়ারের (মাদার হয়ে উঠেছিলেন) অনুরোধে তিনি সেখানে ধ্যান করতে যাননি। তবে জায়গাটি এখন বেদি করে, গাছপালা কেটে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। সেভিয়ার দম্পতি দীর্ঘদিন এই আশ্রমে কাটিয়েছেন। জেমস হেনসি সেভিয়ারের দেহ তাঁরই ইচ্ছেমতো এখানেই পাহাড়ের নীচে সারদা নদীর তীরে দাহ করা হয়েছিল।স্বামীর মৃত্যুর পর শ্রীমতি সেভিয়ারও এখানেই শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন।

    বেলুড়মঠের সঙ্গে যুক্ত থাকলে মায়াবতী আশ্রমের গেস্টহাউজে আপনি থাকতে পারেন। তবে তার জন্য আগে থেকে মঠের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তবে গেস্ট হাউজ না পেলে লোহাঘাট বা পিথোরাগড় যে কোনও জায়গাতেই থাকতে পারেন।

    পিথেরোগড় থেকে লোহাঘাটের রাস্তায় মাড়োরখান থেকে যাওয়া যায় অ্যাবট মাউন্টে। ওক পাইনে ছাওয়া এই রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের মাথায় পৌঁছলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ উপত্যকা সঙ্গে নন্দাদেবী, নন্দাখাত-সহ হিমালেয়র একাধিক শৃঙ্গ।

    মাউন্ট অ্যাবট

    যাতায়াত-হাওড়া থেকে সরাসরি লোহাঘাট আসা যায় না। তাই ট্রেনে কাঠগুদাম বা লখনউ হয়ে আসতে হবে। লোহাঘাট অর্থাত্ মায়াবতী আশ্রমের কাছে রেলস্টেশন হল টনকপুর। সেক্ষেত্রে নৈনিতাল হয়ে আসতেই পারেন। উত্তরাখণ্ডের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র নৈনিতাল।


    নৈনি হ্রদ বা নৈনি তাল

    কাঠগুদাম থেকে সড়কপথে নৈনিতালের দূরত্ব কম-বেশি ৩৫-৩৮ কিলোমিটার। ঘণ্টায় দুয়েকে পৌঁছে যাবেন। এখানে এক বা দু’দিন থেকে  চলে আসুন পিথোরাগড়। দূরত্ব ১৮০ কিলোমিটার। সময় লাগবে ঘণ্টা ছয়েক।পিথেরাগড় থেকে গাড়ি নিয়ে চলে যান মায়াবতী আশ্রম। চাইলে লোহাঘাটেও থাকতে পারেন। লোহাঘাট থেকে মায়াবতী আশ্রমের  দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। পিথোরাগড়ে দেখতে পারেন মানেশ্বর মহাদেব মন্দির, চাঁদ রাজাদের রাজধানী, কেল্লার ধ্বংসাবশেষ, বালেশ্বর মহাদেব মন্দির।