মঙ্গলবার, অক্টোবর 27, 2020

জঙ্গুলে পথে পাড়ি পাহাড়ি উটিতে
জঙ্গুলে পথে পাড়ি পাহাড়ি উটিতে

জঙ্গুলে পথে পাড়ি পাহাড়ি উটিতে

ফটো ক্রেডিট : সুস্মিতা মণ্ডল

  • scoopypost.com - Mar 14, 2020
  • মাইসোর ছাড়িয়ে কালো মসৃণ পিচ রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটতে ছুটতেই চলে এল চেকপোস্ট। গেট পার হতেই দ্রুত বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট। বাড়িঘরের বদলে রাস্তার দু’পাশে তখন সবুজ। অক্টোবরের মাঝামাঝি  জঙ্গল হলুদ ফুলে রঙিন। কী তার নাম জানা নেই। বলতে পারেননি চালকও।জানালেন কর্নাটকের এই জঙ্গলের নাম বন্দিপুর। এটা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট।গিয়েছে বহুদূর। জঙ্গলপথেই শুরু হয়েছে তামিলনাড়ু। সে রাজ্যে জঙ্গল পরিচিত মধুমালাই নামে। চালকের নির্দেশ, “জানালার দু’পাশে ভালো করে দেখতে থাকুন”।বন্দিপুর জঙ্গলে হরিণের ঝাঁক

    সে আর বলতে! চোখ যখন প্রকৃতি শোভায় বিভোর তখনই দেখা গেল তাকে। প্রথমে একটা, তারপর চারটে, আর তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে। চিতল হরিণের দল। তা দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে লেন্সবন্দি করার বাসনা নিয়ে গাড়ি থামানোর কথা বলতেই, বয়স্ক চালকের উত্তর গাড়ি ধীরে যাবে, তবে থামবে না। এটাই জঙ্গলের নিয়ম। আর সেই নিয়মের বাইরে যেতে তিনি পারবেন না। কী আর করা! গজগজ করতে করতে চলন্ত গাড়ি থেকেই চলল মোবাইল ক্লিক। পরে অবশ্য মালুম হয়েছিল, চালকের অভিজ্ঞতার দৌড়। কারণ, পর্যটকদের আরও দু’টি গাড়ি হরিণ দেখে থেমে যাওয়ায় বনকর্তারা সেই গাড়ি অনুসরণ করে মোটা টাকা ফাইন করেছিলেন।বান্দিপুরের সবুজ জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছে পরিষ্কার রাস্তা। যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সেই সবুজের পারে ছোট ছোট পাহাড়ের উঁকিঝুকি।চাইলে বিশেষ অনুমতি নিয়ে এখানে জঙ্গল সাফারি করা যায়। তার জন্য বন দফতরের গাড়িও আছে। বরাত ভালো থাকলে কোর এরিয়ায় বাঘের দেখা মিলতেও পারে। তবে শর্ট ট্রিপে সে সুযোগ আমাদের ছিল না। কারণ, পাহাড়ি উটি তখন আমাদের ডাকছিল।নীলগিরির কোলে পর্যটন কেন্দ্র উটি

    বন্দিপুর বা বান্দিপুর ফরেস্ট ছাড়িয়ে সুইফট ডিজায়ার তখন চলেছে মধুমালাই জঙ্গলের পথ ধরে। চড়াই-উৎরাই রাস্তা।মাইসোর থেকে উটি যাওয়া যায় দু’ভাবে।মাসাইনগুড়ি-কাল্লাতি হয়ে উটি রোড। এই রাস্তা একটু খাড়াই। তবে ছোট গাড়ি যেতে পারে। আর একটা রাস্তা গুদালুর-পাইকারা হয়ে উটি রোড। কোন রাস্তা দিয়ে যাওয়া হবে এ নিয়ে আলোচনা চলতে চলতেই সবুজ সংকেত মিলল কাল্লাতি হয়ে যাওয়ার। জঙ্গল শেষে শহুরে বাড়িঘর, বাজার দেখে মনটা কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে পরে বুঝেছিলাম জঙ্গল  ট্রেলার ছিল। বাকি তো ছিল পিকচার। পাকদণ্ডি বেয়ে গাড়ি যতই উঠছিল ততই যেন পরতে পরতে সৌন্দর্য ঝরে পড়ছিল নীলগিরির। আকাশে মেঘ। সেই মেঘের ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে সূর্যের আলো। চারপাশ সবুজ। পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে বাড়িঘর। দেখতে দেখতেই পৌঁছলাম পাহাড়ি শহরটিতে।

    মাইসোর থেকে উটির দূরত্ব মাসানগুড়ি হয়ে এলে ১২৪ কিলোমিটার, পাইকারা হয়ে এলে ১৫৮ কিলোমিটার। আমাদের মোটামুটি সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো লেগেছিল।

    উটির রোজ গার্ডেন

    অক্টোবরের মাইসোরে ঠান্ডা না-থাকলেও বৃষ্টিভেজা উটিতে হালকা পুলওভার দরকার হয়। রাতে কম্বলও গায়ে টানতে হয়। পাহাড়ি উটিতে অভ্যর্থনা জানাতে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। যদিও সেই অভ্যর্থনা ভালো লাগেনি। শীতের জায়গায় নরম রোদ্দুর ঢের ভালো। বৃষ্টি পড়লেও, ঘরে থাকার সময় কই। অগত্যা ছাতা মাথায় অটো ধরে ঘোরা হল এখানকার রোজ গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন-এ। কোথাও গোলাপ কোথাও রং বাহারি ফুল দিয়ে নকশা। পাহাড়ের ধাপে ধাপে দুই বাগানই বেশ ভালো। তবে আহামরি নয়।

    বোটানিক্যাল গার্ডেন

    নীলগিরির রূপ যদি তামিলনাড়ুর পাহাড়ি জনপদের অন্যতম আকর্ষণ হয় তবে আর এক আকর্ষণ অবশ্যই এখানকার চকোলেট। না কলকাতায় এমনটা চোখে পড়ে না। সার দেওয়া দোকান। সবই চকোলেটের। নানা রকম। আহা! জিভে জল আসবে না হয়! আর হ্যাঁ, এখানকার কফি অত্যন্ত স্বাদু।দুই বাগান দেখে শীতের রাতে হোটেলে ঘরে সেঁধোলাম।

    চা-বাগিচার শোভা

    না, পরের দিনে সকাল সত্যি অসাধারণ ছিল। মেঘের লেশমাত্র নেই। নীল আকাশ। সূয্যিমামা চারদিকে আলো ছড়িয়েছে।সকাল সকাল বেরোনো। চা কারখানা হয়ে যেতে হবে চা-বাগানের কোলে কুন্নুরে। শুরুতে অবশ্য দোদাবেতা পিক। যা সুইসাইড পয়েন্ট নামেও খ্যাত। যদিও পাহাড়ের ওপরের ভিউ পয়েন্ট থেকে চারপাশ দেখার সময় মরার নয়, বাঁচার সাধই হয়। সেখান থেকে ভাড়া করা গাড়ি ছুটল চা কারখানায়। নামে চা-কারখানা, তৈরি হয় চকোলেটও। আর কেনাকাটির তালিকা শেষ হওয়ার নয়। মাথাব্যাথা থেকে গেঁটেবাত, সুগন্ধি, কফি, চা, মশলা কী নেই! পটাপট কেনাকাটি শেষে পাড়ি এবার কুন্নুর।

    কুন্নুরের ল্যাম্বস রক 

    পাহাড়ি পথের পাশে চায়ের বাগান।বাগানকে কেন্দ্র করে দর্শনীয় স্থান কেটি ভ্যালি, হিডেন ভ্যালি। রয়েছে ডলফিন নোজ, ল্যাম্ব রক, রালিয়া ড্যাম। তবে আলাদা আলাদা পয়েন্টের চেয়েও কুন্নুর জায়গাটাই ভারি সুন্দর। ল্যাম্ব রক পাহাড়ের ওপর। সেখান থেকে দেখা যায় শহরের অনেকটা।

    কুন্নুর স্টেশন

    এখানে একটা গল্প আছে। সেটা হল, হেরিটেজ টয়ট্রেনের। যাওয়াটা গাড়িতে হলেও, ফেরাটা ছিল ট্রেনে। আর সেই ট্রেনে চড়ার পরই কেউ বুঝতে পারবে মজাটা কোথায়। কুন্নুর থেকে উটি সারাদিনে কয়েক জোড়া টয়ট্রেন যায়। উটির আরও একটি নাম আছে উদগমণ্ডলম। স্টেশন সেই নামেই। হেরিটেজ টয়ট্রেনের একঝলক রইল ভিডিওতে...

    উটি স্টেশনে হেরিটেজ ট্রেনের রেপ্লিকা

    ঘোরা যখন হল, উটির ফেমাস ফুড বাদ যাবে কেন? পেপার ধোসা নাম শুনেছেন কি? যদি না শুনে থাকেন তাহলে বরং চেখে নিন। পেপারের মতো ক্রিস্পি ধোসা, টেবিলের মতোই বিশাল। দেখনদারির জন্যই এর নাম টেবিল ধোসাও।

    টেবিলজোড়া পেপার ধোসা

    সে সব দিব্যি সাঁটিয়ে কাটিয়ে ফেললাম দ্বিতীয় দিনও। পরের দিন ফেরার পালা। উটি থেকে সোজা বেঙ্গালুরু। তবে বাকি ছিল যে উটি লেক দেখা। উটির তৃতীয় দিনে তাই মর্নিং ওয়াকে পৌঁছলাম উটি লেকে। পাইনের বনে লেকের জলে স্পিডবোটের ধাক্কায় ঢেউ খেলছে। তার পাশে সাজানো বাগানে ফুটে হরেক ফুল। পার্ক ঘিরে ছোট-মেজো ক্যাফে।স্পিডবোটেই হল লেক ভ্রমণ।

    উটি লেক, চলছে বোটিং

    এবার বিদায় বেলা। না ফেরার সময়ও হতাশ হবেন না। কারণ পাইকারার পথ যে দেখা বাকি। রয়েছে পাইকারা লেক, ঝরনা। গুদালুরুর রাস্তায় একের পর এক চায়ের বাগান। নেমেছে প্যাঁচোয়া রাস্তা। রাস্তার প্যাঁচে প্যাঁচে সৌম্দর্য। তবে হ্যাঁ, ওই মোশন সিকনেস মানে চলতি কথা বমির প্রবণতা থাকলে এ রাস্তা কিঞ্চিৎ জ্বালাবে বটেই।পাহাড় ছেড়ে সোজা হল রাস্তা। ফেরার পথে বৃষ্টি নয়, সঙ্গ দিয়েছিল মেঘ। বন্দিপুর জঙ্গলে রাস্তা আটকেছিল বাইসনের দল। জঙ্গলের জলাশয়ে দেখা দিয়েছিল খান দুই হাতিও। কে, জানে প্রকৃতি টের পেয়েছিল বুঝি ফেরার বেলায় মন খারাপ। তাই মন ভোলাতে মেঘলা আকাশে মেলে ধরেছিল রূপের ডালি। সে পথে হরিণ আবার রাস্তা পার হতে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছিল বলে। জোরে ব্রেক কষায় সে যাত্রায় বরাতজোরে চিতলেরও রক্ষা, আমাদেরও।

    এভাবেই শেষ হল জঙ্গলের পথ, তারপর আবার মাইসোর। সবশেষে ঝাঁ-চকচকে বেঙ্গালুরু এয়ারপোর্ট। যাত্রা শেষ। তবে হয় কি শেষ? ফিরতি উড়ানেই তাই পরের ট্রিপের ভাবনা...

    জরুরি তথ্য- উটির কাছে রয়েছে কোয়াম্বাটুর বিমানবন্দর। দূরত্ব ৮৮ কিলোমিটার। বেঙ্গালুরু এয়ারপোর্ট হয়েও আসা যায়। এয়ারপোর্ট থেকে উটি যদিও লম্বা জার্নি। দূরত্ব ৩২০ কিলোমিটারের ওপর। পাহাড়ি ও জঙ্গলের পথের জন্য অনকেটা দূরত্বই গাড়ি যথেষ্ট আস্তে চালাতে হয়।তারওপর বেঙ্গালুরুর যানজটের জেরে এই রাস্তা যেতে ৯ ঘণ্টার বেশি লাগতেই পারে। তাই সময় বুঝে বের হওয়া দরকার।বিশেষত ফ্লাইট ধরার থাকলে হাতে ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে বের হন।

    হোটেল-গাড়ি খরচ

    বিভিন্ন মানের দামের হোটেল মিলবে। গাড়ি গো আইবিবো, মেক মাইট্রিপের মতো সংস্থা থেকেও বুক করতে পারেন। অনেক সময় সেখানে সস্তা হয়। আবার অনস্পটও দামদর করতে পারেন।মাইসোর থেকে উটি ছোট গাড়ি খরচ মোটামুটি ২,৫০০-৩,৫০০ এর মধ্যে।উটি সাইট সিইং কুন্নুর নিয়ে ২৪০০-৩০০০।উটি থেকে বেঙ্গালুরু এয়ারপোর্ট ৭০০০-৮০০০ টাকা খরচ পড়বে।

    রেলপথ-উটি রেলস্টেশন তামিলনাড়ুর বড় বড় রেলস্টেশনের সঙ্গে যুক্ত। কোয়াম্বাটুর থেকে ট্রেনে উটি আসা যায়। দূরত্ব ৮৪ কিলোমিটার। বেঙ্গালুরু থেকে সরাসরি ট্রেন নেই। তবে ট্রেনে বেঙ্গালুরু থেকে মাইসোর চলে এলে, মাইসোর থেকে উটির দূরত্ব অনেকটাই কম হয়।কুন্নুর-উটি রেলপথের দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। হেরিটেজ টয়ট্রেনের টিকিট রেল থেকে অনলাইনেই মেলে।

    কেনাকাটা

    চকোলেট তো আছেই। আছে এখানকার ফেমাস নীলগিরি অয়েল, লাল তেল । ব্যাথায় অব্যর্থ। এখানকার চকোলেট টি অবশ্যই কিনতে পারেন।কফিও অসাধারণ। এছাড়া আমন্ড অয়েল, কোকোনাট অয়েল, অলিভ অয়েল, টি ট্রি অয়েল কেনা যেতেই পারে।