মঙ্গলবার, নভেম্বর 24, 2020

গোপাল ভাঁড়ের ফাঁসি!
গোপাল ভাঁড়ের ফাঁসি!

গোপাল ভাঁড়ের ফাঁসি!

  • scoopypost.com - Nov 02, 2020
  • সুকুমার রায়ের গোমড়াথেরিয়ামের সঙ্গে গোপাল ভাঁড়ের সখ্যতা যে একেবারেই নেই, তা আর কাউকে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। আসলে স্বভাবআমুদে বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে গোপাল ভাঁড়ের নাম। কিন্তু মৌখিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই গোপাল ভাঁড়ের সবকিছু। লোকমুখে তাঁর গল্প গত তিনশো বছর ধরে ছড়িয়ে দুই বাংলায়। কালে কালে মৌখিক গল্প থেকে বইয়ের দু মলাটে, আবার অ্যানিমেশন ছবি, টেলিভিশনের ধারাবাহিকে দেখা গেছে গোপাল ভাঁড় চরিত্রকে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে কলকাতার বটতলার সাহিত্যে গোপাল ভাঁড়ের গল্পের দারুণ রমরমা ছিল, এ’কথা ইতিহাসই স্বীকার করে। কিন্তু আদৌ কি রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন গোপাল? গোপাল ভাঁড় নামে আদতে কি কোনও মানুষ ছিলেন? নাকি গোপাল অনেকের সমষ্টিতে কল্পিত এক চরিত্র? এর উত্তর এখনও অজানা। গোপালের চরিত্রে একাধিক ডাইমেনশন নিয়ে একাধিক গল্প থাকলেও তার ঐতিহাসিক সত্যতা যে নেই, তা কিন্তু প্রমাণিত।

    এবার একটু ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া যাক। অবিভক্ত বাংলার প্রতাপশালী এক চরিত্র নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। শাক্ত ধর্মে বিশ্বাসী কৃষ্ণচন্দ্র মাত্র আঠেরো বছর বয়সে সিংহাসনে বসেছিলেন। সালটা ১৭২৮। কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও শিল্পসাহিত্যের অনুরাগী। তাঁর সভাসদ হিসেবে ছিলেন মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন, হরিরাম তর্কসিদ্ধান্তের মত মানুষ। যদিও রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নামের সঙ্গে বেইমান তকমাটা জুড়ে গিয়েছিল, যখন ১৭৫৭-য় পলাশীর যুদ্ধের আগে তিনি নবাববিরোধী শিবির ও ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। এই কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়, এমন বক্তব্য পণ্ডিতদের। এ বিষয়ে কোনও পাকাপাকি সিদ্ধান্তে না এলেও এই মতের পক্ষে সায় দিয়েছেন অনেকেই। ‘বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা’ বইয়ে অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘গোপাল রসিক-চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড় ছিলেন।’১৯৫২ সালে হোমশিখা পত্রিকা গোপাল ভাঁড়ের উপর বিশেষ একটি সংখ্যা প্রকাশ করে। সেখানে ‘গোপাল ভাঁড়ের নামে প্রচলিত গল্পসংগ্রহ’ নামের প্রবন্ধে অধ্যাপক মদনমোহন গোস্বামীও একই কথা লিখেছেন। ‘শোনা যায়, মহারাজের(রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের)সভায় আরেকটি রত্ন ছিলেন—তিনি স্বনামখ্যাত রসসাগর গোপাল ভাঁড়।’ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়ের সময় থেকে আমাদের এই সময়ের দূরত্ব ৩০০ বছরের। কিন্তু মাত্র ৩০০ বছরের আগেকার একজনকে নিয়ে এত ধোঁয়াশা থাকবে কেন, যেখানে তাঁর সমসাময়িক কৃষ্ণচন্দ্র, ভারতচন্দ্র সম্পর্কে বহু সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়।

    পণ্ডিতেরা বা ইতিহাস যাই বলুন, গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে আরও একটি মনোরঞ্জন কাহিনী আছে। ‘কাহিনী’ বলার কারণ, এরও কোনও ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। শোনা যায় নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা নাকি গোপাল ভাঁড়কে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। গোপালকে নিয়ে চলতি নানা গল্প-কাহিনীর মধ্যে এই ব্যাপারটি কিন্তু কখনও তেমনভাবে সামনে আসেনি। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে মনোমালিন্য, কথা কাটাকাটি, রাগ-গোঁসা এসব নিয়ে গল্প আমরা সবাই জানি। কিন্তু স্বয়ং বাংলার নবাব গোপাল ভাঁড়কে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন, এও কি সত্যি? চলুন শুনে নিই সেই গল্প। 

    সালটা ছিল ১৭৫৭, বাংলা বিহার উড়িষ্যার মসনদে আসীন তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা। মীরজাফর, ঘষেটি বেগম, জগতশেঠ, উমিচাঁদরা তখন তাঁকে সিংহাসনচ্যূত করার ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত। যে ষড়যন্ত্রের সর্বাগ্রে লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর সুযোগ্য প্রতিনিধি ওয়ারেন হেস্টিংস। এই সময়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রও নবাব বিরোধী এই বলয়ে যোগ দিয়েছিলেন। প্রথম থেকেই নাকি কৃষ্ণচন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন গোপাল ভাঁড়। কিন্তু তাতে রাজা কর্ণপাতও করেননি। রাজার অন্যান্য সভাসদরা কৃষ্ণচন্দ্রের এই সিন্ধান্তকে সমর্থন করলেও একমাত্র গোপালই বেঁকে বসেন। তিনি রাজাকে এও বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, নিজের দেশের নবাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজদের মত বিদেশি শক্তির হাত না ধরতে। গোপালকে এ নিয়ে বিদ্রুপেরও শিকার হতে হয়। শেষে গোপাল ভাঁড়কে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একটি অসাধ্যসাধন করার কথা বলেন। হাসির ছলে তিনি বলেন, নবাবকে গিয়ে যদি গোপাল ভেংচি কেটে আসতে পারে, তাহলেই তিনি এই সিদ্ধান্ত বদলের কথা ভাববেন। তাতেই রাজি হয়ে গোপাল গেলেন মুর্শিদাবাদ। কিন্তু নবাবের হিরাঝিল প্রাসাদের রক্ষীরা কিছুতেই গোপালকে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিল না। কোনও কথাতেই কোনও কাজ হচ্ছে না দেখে গোপাল দিলেন এক রক্ষীর হাতে কামড় বসিয়ে। সে এক হৈ-হৈ কাণ্ড। প্রহরীরা তাঁকে ধরে নিয়ে গেল নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার কাছে। নবাব সব শুনে গোপালকে জিজ্ঞেস করলেন, কি নাম, কোথা থেকে এসেছ, কি চাও? গোপাল নিরুত্তর। শুধু নবাবের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে দিল সে। সিরাজ তো অবাক। ভাবছেন এ কী? এর মধ্যে আরও বার চারেক নবাবকে ভেংচি কেটে দিয়েছেন গোপাল। বিরক্ত নবাব গোপালকে আটক করার নির্দেশ দিয়ে বললেন পরের দিন তার বিচার হবে। কিন্তু গোপাল তো জানেন, তাঁকে বেঁচে সশরীরে ফিরতে হবে কৃষ্ণনগরে। যেখানে গিয়ে তিনি নবাবকে ভেংচি কাটার কথা বলে আদায় করে নেবেন কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতিজ্ঞা। তাই, এর ফাঁকে তিনি মীরজাফকে বললেন, তিনি এসেছেন সকল ষড়যন্ত্রের কথা নবাবকে ফাঁস করে দিতে। কিন্তু রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কোনও ক্ষতি হোক তা তিনি চাননা। প্রমাদ গণলেন মীরজাফর। তিনি নবাবকে বললেন অতি দ্রুত যেন এই ব্যক্তির ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়। সেইমত গোপালের ফাঁসির আদেশও জারি করা হয়ে গেল। এতেও গোপালের কোনও হেলদোল নেই। নবাব যখন জিজ্ঞাসা করলেন ফাঁসির আগে তার কিছু বলার আছে কিনা, তাতেও গোপাল নবাবের মুখে দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে দিলেন। নবাব ভাবলেন এতো বদ্ধ উন্মাদ। একজন উন্মাদকে ফাঁসি দিয়ে শেষে ভুল করছেন না তো! এসব সাতপাঁচ ভেবে সিরাজ গোপালকে মুক্ত করে দিলেন। দেশপ্রেমিক গোপাল ফিরে গেলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও কৃষ্ণচন্দ্র সাফ জানিয়ে দিলেন কোনও অবস্থাতেই তিনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবেন না। অভিমানী, আশাহত গোপাল ঠিক করলেন আর তিনি কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় থাকবেন না। কাউকে কিছু না বলে, ব্যথিত গোপাল সপরিবারে সেইদিন রাতেই রাজ্য ত্যাগ করলেন। তারপর থেকে বাংলায় গোপাল ভাঁড়কে আর কখনই দেখা যায়নি। এই কাহিনীরও কোনও ঐতিহাসিক সারবত্তা নেই। কারণ, গোপাল ভাঁড়ের নিজের অস্তিত্ব নিয়েই ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তবু, গোপালের দেশপ্রেম নিয়ে এমন কথা খুব কম মানুষই জানেন।