মঙ্গলবার, নভেম্বর 24, 2020

‘ফাইট’ শেষ, সংসার ফেলে চলে গেলেন অপু
‘ফাইট’ শেষ, সংসার ফেলে চলে গেলেন অপু

‘ফাইট’ শেষ, সংসার ফেলে চলে গেলেন অপু

  • ‘ফাইট সৌমিত্র ফাইট’ এটাই কি তিনি নিজেকে বলছিলেন শেষ সময়!
    আজ আর তার উত্তর পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তবে জীবনে যখনই কঠিন পরিস্থিতি এসেছে তখন রিল লাইফের ক্ষিদ্ দা রিয়েল লাইফে বলেছেন, ‘ফাইট সৌমিত্র ফাইট’ । যখন ক্যানসারের খবর শুনেছিলেন তখন নিজেকে এভাবেই জোর দিয়েছেন সৌমিত্র। যখন করোনা হয়েছিল, তখনও হয়তো একই কথাই বলেছিলেন। তবে করোনা হারালেও, জীবনযুদ্ধে জিততে পারলেন না তিনি।

    আসলে মৃত্যুর মত অমোঘ সত্যের কাছে একদিন না একদিন হারতেই হয়। তবে নশ্বর দেহ উড়েপুড়ে গেলেও বাঙালির কাছে তিনি বড় আপনজন। সংস্কৃতিমনস্কদের মনের মনিকোঠায় চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন ‘অপু’ । জয়বাবা ফেলুনাথ বা সোনার কেল্লায় মগজাস্ত্র প্রয়োগ করা প্রদোষ মিত্র ওরফে ফেলু মিত্তিরও তিনিই। ‘ফাইট কোনি ফাইট’-আইকনিক হয়ে যাওয়া সংলাপ কানে এলেই ভেসে উঠবে ভাঙা চশমার পিছনে অসম্ভব ক্ষুরধার দুটো চোখ আর ক্ষিদ্দার মুখ।


    আসলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শুধুই অভিনেতা, বুদ্ধিজীবী, আবৃত্তিকার, শিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব নন, তিনি বাঙালির আবেগ। তিনি আক্ষরিক অর্থেই আইকন। বাঙালির মন আর মননের সবটুকু জুড়ে আছেন তিনি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মানেই অপু, সৌমিত্র মানেই ফেলুদা। আবার সৌমিত্র মানেই বসন্ত বিলাপের সেই তরুণ, ঝিন্দের বন্দির ময়ূরবাহন। সৌমিত্র মানেই সত্যজিত্ রায়ের নায়ক।

    ৮৫ বছরের জীবনে অসংখ্য ছবি করেছেন। বিশ্বখ্যাত চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ১৪ ছবিসহ তিনি দুশোরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। অপুর সংসার, চারুলতা, অভিযান, অরণ্যের দিনরাত্রি, অশনি সংকেত, সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশে, অরণ্যের দিনরাত্রি, ঘরে বাইরে, গণশত্রু, গণদেবতা, ঝিন্দের বন্দী, তিন ভুবনের পারে, ক্ষুধিত পাষাণ, কোনি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র ও মঞ্চাভিনেতা, পাশাপাশি অসামান্য বাচিক শিল্পী, কবি, লেখক, নাট্যকার এবং নাট্যনির্দেশক। তাঁর কাছে বাঙালির প্রত্যাশা এতটাই যা কখনও, কোনও দিনও শেষ হওয়ার নয়।

    বাঙালির আর এক আবেগ উত্তমকুমারের জীবনের অধ্যায় শেষ হয়েছিল বড় তাড়াতাড়ি। সেই তুলনায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের পরিধিটা আরও একটু বড়। আর তাই আমরা তাঁকে সৃজনশীল আর চিরকালের উন্নতমস্তক অভিনেতা হিসেবে কিছু বেশিদিন পেয়েছে। বাঙালির যেমন ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, তেমনই উত্তম-সৌমিত্র। খেলা থেকে বিনোদন, এভাবেই মেরুকরণ হয়েছে। কোনও তুল্যমূল্য বিচার না করেই বলা যায়, সৌমিত্র তুলনায় অনেক বেশি ডাইভারসিফায়েড ও ডায়নামিক।

    কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর রেডিও প্রেজেন্টার হিসেবে যখন পরিচিত হচ্ছিলেন সৌমিত্র তখন তাঁকে বড় ব্রেক দেন সত্যজিত্ রায়। বিভূতিভূষণের অপু হয়ে ওঠেন তিনি সত্যজিত রায়ের হাত ধরে।১৯৫৯ সালে প্রথম অপুর আত্মপ্রকাশ। আর শুরুতেই বাঙালির হৃদয় জিতে নেন তিনি। তারপর সত্যজিতের হাত ধরে ১৪টি ছবি। তপন সিনহা, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদারের সঙ্গে একের পর এক বিভিন্ন ধারার ছবিতে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। ইন্ডাস্ট্রি যখন রোম্যান্টিক নায়ক উত্তম কুমারকে দেখছে, তখন অন্য ধরনের চরিত্র নিয়ে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করছেন তিনিও।

    সুচিত্রা থেকে তনুজা, শর্মিলা, মাধবী, অপর্ণা-সহ বহু নায়িকার সঙ্গেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র।সমসাময়িক অভিনেতা, অভিনেত্রীদের চলে যাওয়ার কষ্ট নিয়েই কাজ করে গিয়েছেন তিনি। আসলে অবসরে বিশ্বাসী ছিলেন না তিনি। সিনেমার স্বর্ণযুগ শেষে টলিউডে যখন বাংলা ছবির শোচনীয় পরিস্থিতি তখনও ব্যাটিং করেছেন তিনি। যাত্রাও করেছেন।

    এভাবে চলতে চলতেই তাঁর জীবনের ভিত নড়ে গিয়েছিল যখন জানতে পেরেছিলেন তিনি ক্যানসার আক্রান্ত। ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে হারতে শেখেননি। দীর্ঘ চিকিত্সায় সুস্থ হয়ে উঠে ফের কাজে ফিরেছিলেন। একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাত্কার সৌমিত্র নিজে বলেছিলেন, এই সময় তিনি নিজেকে সাহস জুগিয়েছিলেন একটা কথাই বলে, ‘ফাইট সৌমিত্র ফাইট’ ।
    ক্যানসার জয়ের পর দর্শকমনে সাড়া ফেলে দিয়েছেন তিনি ‘বেলাশেষে’ করে। শর্ট ফিল্ম ‘অহল্যা’ প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া ‘বসু পরিবার’, ‘বেলাশুরু’-সহ বহু ছবি করেছেন তিনি জীবনের উপান্তে এসে।

    পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে, লিজিওন অফ অনার, বঙ্গ বিভূষণ-এর মতো সম্মানপ্রাপ্তির পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন অগণিত মানুষের ভালোবাসা।শুধু প্রবীণ নন, নবীনের কাছেও তিনি পছন্দের ফেলুদা, হীরক রাজার দেশের উদয়ন পণ্ডিত।
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজীবন এই মানুষটির অনুপ্রেরণা ছিলেন।অক্টোবরে হাসপাতালে ভর্তির আগে পর্যন্তও কাজ করে গিয়েছেন তিনি। বাঙালির আবেগ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বর্ণময় তাঁর ফিল্মি কেরিয়ার। ছবির সংখ্যা গুণে শেষ করা অসম্ভব। এই বর্ণময় জীবনকেই লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনে বেঁধেছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বায়োপিক ‘অভিযান’-এর শুটিংও শেষ করেছেন তিনি। যে বায়োপিকে সৌমিত্রর কম বয়সের চরিত্রে অভিনয় করেছেন যিশু সেনগুপ্ত আর পরিণত বয়সটা সৌমিত্র নিজেই। করোনা পরিস্থিতির জন্যই রিল ও রিয়েল দুটো ‘অভিযান’ ই থমকে গিয়েছে। রিল লাইফে ‘অভিযান’ শুরু হবে, তবে একটাই দুঃখ নিজের অভিযান আর প্রেক্ষাগৃহে বসে দেখতে পাবেন না বাঙালির নায়ক সৌমিত্র।

    তবে তাঁর ‘অভিযান’ বাঙালির মনে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে চিরকাল। তাঁর চলে যাওয়া যে বিশাল শূণ্যতা তৈরি করল যা কখনও পূরণ হওয়ার নয়।