বুধবার, এপ্রিল 14, 2021

ভারতের মোৎজার্ট সলিল চৌধুরী
ভারতের মোৎজার্ট সলিল চৌধুরী

ভারতের মোৎজার্ট সলিল চৌধুরী

  • scoopypost.com - Nov 19, 2019
  • ভারতবর্ষে তাঁর মতো ভার্সেটাইল মিউজিশিয়ান বোধহয় কেউই আসেননি। কারণ ভারতে অনেক দিকপাল শিল্পীরা জন্মালেও সলিল চৌধুরী সত্যিই একটা মাইলস্টোন। নাহলে শচীন কর্তার মতন কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী তথা পরিচালক কখনও আক্ষেপ করেন যে, পঞ্চম অর্থাৎ রাহুলদেব বর্মন নাকি ওর বাবার থেকেও সলিলদার গান বেশি শোনেন! শুধু বাংলা কেন গোটা ভারতের সঙ্গীত পাগল মানুষ বলবেন যে, তিনি মোৎজার্টের বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্করণ।

    যেমন ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকের রাগরাগিনীর উপর সাবলীল দখল তেমনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের উপর অনায়াস ব্যবহার। দুটিকে আপন খেয়ালে মিলিয়ে আশ্চর্য আশ্চর্য সব সুর-সৃষ্টি করে গেছেন।    

    শুধু কি গান? রান্নাতেও কি অপরিসীম দক্ষতা তা যাঁরা তাঁর রেসিপি চেখেছেন তাঁরাই জানেন। তাঁর কথায় ভালো রান্না আর মিউজিক কম্পোজ দুটোই ভালো করে জানতে হয়। কারণ দুটোরই নাকি একই কেমিস্ট্রি! একটু নুন কম হলে যেমন গোটা রান্নাটাই মাটি। তেমনি সুরে ও স্বরে ঠিকঠাক মিশ্রণ নাহলে সেটা আর গান থাকেনা মেশিনগান হয়ে যায়। এমনই রসিক সাধক ছিলেন তিনি।

    তিনিই পারেন হেঁকে ডেকে পৃথিবীর গাড়িটা থামাবার কথা বলতে! তাঁর লেখকসত্ত্বা, কবি সত্ত্বা সব কিছুতেই যেন বিশেষত্বের ছাপ থাকত নাহলে বিমল রায়ের মতন মানুষ তাঁর রিক্সাওয়ালা গল্প অবলম্বণে কেন ছবি বানাবেন? বিমল রায়ের বদান্যতায় সলিল চৌধুরী শুধু গল্প লেখকই নয়, চিত্রনাট্যকার এবং অবশ্যই সুরকার হিসাবে মুম্বইয়ের মতন জায়গায় প্রতিষ্ঠার ভিত তৈরি করলেন। ছবি রিলিজ হল-“দো বিঘা জমিন”বাকিটা ইতিহাস! অনবদ্য শৈলেন্দ্রর রচনা ও সলিলের সুর মিলে তৈরী হল গান-‘ধরতি কহে পুকার কে, বীজ বিছা লে প্যার কে, মৌসম বিতা যায়, মৌসম বিতা যায়!’ গোটা দেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরতে লাগল-‘মৌসম বিতা যায়, মৌসম বিতা যায়!’ এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

    বিমল রায় এবার করলেন ‘মধুমতী’ । নায়ক দিলীপকুমার। অনেক বুঝিয়ে দিলীপ কুমারকে রাজি করানো হল যে, সলিল ও শৈলেন্দ্র জুটিই সুর করবে। দিলীপ কুমারের মান রাখলেন সলিল চৌধুরী। ছবি রিলিজের সঙ্গে সঙ্গে গোটা ভারত মজে গিয়েছিল তাঁর সুরের জাদুতে। আহা! কি সব গান!—  ‘আজা রে পরদেশি’, ‘চড় গয়ি পাপী বিছুয়া’, ‘দিল তড়প তড়প কে কহ রহা হ্যায় আ ভি জা’,  ঘড়ি ঘড়ি মেরা দিল ধড়কে, সুহানা সফর ঔর ইয়ে মৌসম হাসিন’, ‘টুটে হুয়ে খোয়াব নে’…। দিলীপ সাবের অন্তরঙ্গ হতে তাই তাঁর বেশিদিন লাগেও নি। মুসাফির ছবিতে তাঁকে দিয়ে গানও গাইয়ে ছিলেন সলিলবাবু।

    নোকরির সেই গান- ছোটা সা ঘর হোগা বাদলোঁ কি ছাঁও মে! তারপর আনন্দ! জিন্দেগি ক্যাইসি হ্যায় পহেলি..কভি তো হাসায়ে কভি ইয়ে রুলায়ে! কি কিশোরকুমার, কি মান্না দে, কিম্বা মুকেশ মাথুরই হোক সলিলের সুরে সকলেই সাবলীল। সুর তো নয়, যেন জাদু! সমস্ত বাদ্যযন্ত্রতেই সিদ্ধহস্ত! বিদেশে অর্থাৎ রাশিয়াতে অর্কেস্ট্রাইজেশন দেখে ভারতেও শুরু করলেন তিনি। শুরু হল-বম্বে ইয়ুথ কয়্যার! তারপর বাংলাতেও ক্যালকাটা কয়্যার!

    এতো গেল মুম্বইয়ের গীতিকথা! বাংলায় আরো মজার মজার কথা আছে। খুব সাধারণ বেশে পকেটে একটা চিরকুট নিয়ে তিনি এক সকালে গিয়ে পৌঁছলেন প্রবাদ প্রতিম শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে। নিবেদন করলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের দুটি ছড়ায় তিনি সুর করেছেন। যদি একবার শোনেন তবে সেবারের শারদ-অর্ঘ্যে রের্কডিং হতে পারে! হেমন্তবাবু তো আকাশ থেকে পড়লেন! ছড়ার গান! তবু অনেক অনুরোধের পর নিমরাজি হয়েই শুনলেন সলিলের সুরারোপ। পালকির গান আর রানার শুনেই হেমন্তবাবু অবাক! সামান্য ছড়ায় এত অসাধারণ সুর হতে পারে? এবার ঝুলি থেকে আরেকটি বোমা বেরোলো! গায়ের বঁধু! তারপর? তার আর পর নেই! লিখে শেষ করা মুশ্কিল! সলিল চৌধুরীর অমর সৃষ্টি তাঁকে আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায় অমর করে রেখেছে। আজ তাঁর ৯৫তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিনে তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।