মঙ্গলবার, অক্টোবর 20, 2020

সন্ধিপুজোর তাৎপর্য কী?
সন্ধিপুজোর তাৎপর্য কী?

সন্ধিপুজোর তাৎপর্য কী?

  • scoopypost.com - Oct 06, 2019
  • জয়ন্ত ঘোষ

     

    সন্ধিপুজো মানে সন্ধিক্ষণের পুজো। দুর্গাপুজোর নির্ঘন্ট অনুযায়ী অষ্টমী তিথির অন্তিম দণ্ড এবং নবমী তিথির সূচনা দণ্ডের সন্ধিক্ষণে যে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়ে থাকে শাস্ত্রে তাকেই সন্ধিপুজো বলা হয়। এই দণ্ড হল আধুনিক সময়ের হিসাবে ২৪ মিনিট অর্থাৎ দুই তিথির দণ্ড ধরলে ৪৮ মিনিট হল সন্ধিপুজোর মূলত সময়বন্ধকতা। এই সময়ের মধ্যেই যাবতীয় উপাচারের কাজ সম্পন্ন করে সন্ধিপুজো সম্পূর্ণ করতে হয়। এই সন্ধিক্ষণ কিন্তু ২৪ ঘন্টায় মোট ৪ বার আসে। প্রথমত, ঊষালগ্নে অর্থাৎ রাতের শেষ ও দিনের শুরুতে। দ্বিতীয়ত, গোধুলি লগ্নে অর্থাৎ দিনের শেষ ও রাতের শুরুতে। তৃতীয়ত, মধ্যাহ্নে অর্থাৎ পূর্বাহ্নের শেষ ও অপরাহ্নের শুরু। চতুর্থত, মধ্যনিশায়। অর্থাৎ রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের শেষ ও তৃতীয় প্রহরের সূচনা। এই চারটি সন্ধিক্ষণের উৎকৃষ্ট ক্ষণই হল চতুর্থক্ষণটি। কারণ, এই সময় সবচেয়ে নিঃশব্দ নিথর হয়ে যায় ব্রহ্মাণ্ড। সাধারণত এই সন্ধিক্ষণগুলিতে জাগতিক আবহাওয়া ধীর, স্থির, শান্ত হয়ে যায়। পশুপাখী, উদ্ভিদ-প্রাণী সকলেই তখন নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকে। তাই বায়ুমণ্ডলের ইথার তরঙ্গে একটা আধ্যাত্মিক ভাবস্রোত বইতে থাকে। সেইজন্য বেদজ্ঞ ঋষিগণ এই নির্দিষ্ট সময়েই সাধকের জন্য জপ, ধ্যান ও নাম-গুণগানের প্রশস্তি সময় বলেছেন। এই প্রসঙ্গে স্মৃতিসাগর গ্রন্থে বলা হয়েছে যে -অষ্টম্যাঃ শেষো দণ্ডশ্চ নবম্যাঃ পূর্ব এব চ। অত্র যা ক্রিয়তে পূজা বিজ্ঞেয়া সা মহাফলা।

    অর্থাৎ সন্ধিক্ষণে অষ্টমীর অন্তে ও নবমীর সূচনায় যে পূজা নিবেদিত হয় তা মহাফল প্রদান করে। এই সন্ধিপূজা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুজো এবং ততোধিক মহা শুভক্ষণ। দেবী মহামায়া এই সময় বিশেষভাবে জাগ্রতা হয়ে ওঠেন এবং আসুরিক শক্তিকে নাশ করেন। সেই কারণেই সন্ধিপুজো দর্শনে সর্বকল্যাণ সাধিত হয়। মধ্যরাতের যে সন্ধিক্ষণ সর্বোৎকৃষ্ট সেইসময়ে পুজোবিধি সবচেয়ে প্রশস্তি কারণ এই সময়ে পুজো করলে সহস্রগুণ ফল লাভ হয়। এখন প্রশ্ন হল এই সন্ধিপুজো এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? এর তিনটি কারণ আছে-

    ১) এই সময়ে দুর্গার পরিবর্তে অতীব শক্তিশালী দেবী চামুণ্ডা-কালিকার আরাধনা করা হয়।

    ২) ত্রেতাযুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র মহাপ্রতাপশালী রাবণকে নিধনের নিমিত্তে দেবী চণ্ডিকার বর এই সন্ধিক্ষণেই পেয়েছিলেন।

    ৩) এই সন্ধিক্ষণেই জপ, ধ্যান, পরম ফললাভ করায়। এইসময়ে দেবীর দর্শন ও অনুধ্যান সর্বাপেক্ষা অধিক ফলপ্রসু। দেবী চামুণ্ডা মাতা অম্বিকার আজ্ঞাচক্র অর্থাৎ তৃতীয় নয়ন থেকে উৎপন্ন হেয়ছেন। যা শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বর্ণিত আছে। এই দেবী চণ্ডিকাই চণ্ড ও মুণ্ডের বিনাশিনী বিশ্বেশ্বরী তাই জগত সংসারে তিনি দেবী চামুণ্ডারূপেই প্রসিদ্ধ। দৈত্যরাজ শুম্ভের সেনাপতিদ্বয় চণ্ড ও মুণ্ড আসলে মানব মনের প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি! তন্ত্রে ত্যাগ আর ভোগের বিনাশ না হলে মহামায়ার কৃপালাভ হয় না। দুর্গাপূজায় ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের লাভে মায়ের একাত্মা স্বরূপে আনন্দময় সত্ত্বায় সিদ্ধিলাভ সম্ভব হয়।

    এই সন্ধিপুজোর পূণ্যলগ্নেই ভক্তভৈরব গিরিশচন্দ্রের দুর্গাপূজায় জগজ্জননী মা সারদা তাঁর বসতবাটিতে শুভ পদার্পন করেছিলেন। সন্ধিপুজোয় বলিদানের বিধান থাকলেও মা সারদার আদেশে পশুবলি হয় না। সেক্ষেত্রে কুমড়ো, কলা, আঁখ প্রভৃতিতেই প্রতীকী বলি সম্পন্ন হয়। সন্ধিপুজোয় বলিদান হল মানব জীবনের অন্ত্যস্থ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই ছয়টি ষড়রিপুর বিনাশী বলিদান! সন্ধিপুজোর নৈবেদ্যতে দেবীর বস্ত্র, অলংকার, ফলমূলাদি প্রভৃতি ভক্তি সহকারে নিবেদন করা হয়। সন্ধিপুজো আদতে তন্ত্রমতের পূজা। অত্যন্ত সতর্ক হয়ে সাত্ত্বিকভাবে ভক্তিভরে সন্ধিপুজো করলে দেবীর প্রসন্নতা ও কৃপালাভ সহজেই করা যায়। যিনি এই সন্ধিপুজো সার্থক করে তুলতে পারেন তাঁর জীবনে সকল সিদ্ধি বিরাজ করে এতে কোনও সন্দেহ নেই।

    ওঁ মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনী।

    আয়ুরাগ্যেবিজয়ং দেহি দুর্গে দেবি নমোহস্তুতে।।