রবিবার, অক্টোবর 25, 2020

খাসিদের দুগ্গাপুজো !
খাসিদের দুগ্গাপুজো !

খাসিদের দুগ্গাপুজো !

  • scoopypost.com - Oct 06, 2019
  • জয়ন্ত ঘোষ

    ভারতের এক প্রত্যন্ত রাজ্য মেঘালয়। খাসি, জয়ন্তিয়া, গারো, এই তিন পাহাড়ে ঘেরা গিরিরাজ্য। ১৯২৪ সালে সেখানেই স্বামী প্রভানন্দজী অর্থাৎ কেতকী মহারাজ শিক্ষার আলো নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর সম্বল বলতে কিছুই ছিল না। ৪-৫ জন শিশুকে পড়াতেন মাটিতে বসেই। আর সঙ্গে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিতেন কাছাকাছি বাস করা অসুস্থ গ্রামবাসীদের। এভাবেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সেবায় মন জয় করে নেন স্থানীয় আদিবাসীদের। তারপর শুরু হল রামকৃষ্ণ মিশনের মেঘালয় শাখা। মহারাজ শুধু দুর্গাপুজোর সময় পাহাড় থেকে নেমে চলে যেতেন সমতলে। সেখানে শ্রীহট্ট (সিলেট)-এ রামকৃষ্ণ মিশনের পুজোয় যোগ দিতে। সেইসময় তাঁর সঙ্গে যেতেন কয়েকজন আদিবাসী নারী ও পুরুষ। একবার ফিরে এসে স্থানীয় খাসি মানুষেরা তাঁকে বললো- মহারাজ! আমরাও দুর্গাপুজো করবো। সম্ভবত ১৯২৮ সালে সেই শুরু হলো খাসিদের দুর্গাপুজো । আজ ৯১ বছরে পদার্পন করলো সেই পুজো। খাসি পাহাড়ের পূর্বাঞ্চলে দক্ষিণদিকের গ্রাম। স্থানীয় ভাষায় তার নাম ডিশং শেলা। শেলা বাজার থেকে হাঁটতে হয় পাহাড়ী গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। আধঘণ্টা বাদে আসে এক ছোট্ট গ্রাম, সেটি শেলা নদীর পাশে। রামকৃষ্ণ মিশনের এই শাখাটি কিন্তু চালান স্থানীয় মহিলা পুরুষ সমস্ত আদিবাসীরাই। চলে তিনটি স্কুল, লাইব্রেরী। স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কর্মবৃত্তি শেখার ব্যবস্থা। আদিবাসীদের সশক্তিকরণে রামকৃষ্ণ মিশনের এ এক উজ্জ্বল নিদর্শন। স্বামী সোমেশ্বরানন্দ মহারাজের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়। তারই বয়ানে- সময়টা ছিল ১৯৭৬ সাল। আমি তখন ব্রহ্মচারী সর্বচৈতন্য। সৌভাগ্য হয়েছিল শেলার দুর্গাপুজোয় উপস্থিত থাকার। আশ্রমে বাঁধানো বড় মন্ডপ। ওখানেই পুজো হয়। একমাস আগেই শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ, আগের কাঠামোতেই মাটিদান। সাবেকি একচালা প্রতিমা, ডাকের সাজ, ঠিক বেলুড় মঠেরই মতো। মৃৎশিল্পী আসেন বাইরের গ্রাম থেকে। পুজোর ৪-৫ দিন আগে চেরাপুঞ্জি আশ্রম থেকে মহারাজেরা চলে আসেন। পুজো করেন ব্রহ্মচারী। কিন্তু সব ব্যবস্থা স্থানীয় আদিবাসীদের। মহিলারাই মূল পরিচালিকা শক্তি। বোধন, নবপত্রিকা, পুজো, সবকিছুই হয় একেবারে শাস্ত্রমতে। সাধু বসেন পুরোহিতের আসনে। কিন্তু নৈবেদ্য সাজানো, ভোগ তৈরি, পুজোর উপকরণ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে দেওয়া, সবই করে আদিবাসী মেয়েরা। আশ্রমের ছাত্রী, শিক্ষিকাদের সাথে হাত মেলায় গ্রামের অন্য কিশোরী-তরুণীরাও। তাদেরই পুজো। শুধু চাঁদা তোলা, চাল-ডাল সংগ্রহ করা বিভিন্ন বাড়ি থেকে, বাজার থেকে জিনিসপত্র ও সব্জি কেনা, এগুলো পুরুষদের কাজ। কিন্তু অন্য সবকিছুর দায়িত্ব মহিলাদের। এমনকি পুরুষেরা কে কি কাজ করবে সেটাও মেয়েরাই ঠিক করে দেয়। এককথায় এ হলো মায়েদেরই দুর্গাপুজো। এমনকি চেরাপুঞ্জির অধ্যক্ষ গোকুলানন্দ মহারাজ কিছুটা গুরুত্ব পেলেও আমার মতো অন্য সাধুরা বসে-বসে পুজো দেখা ছাড়া কিছুই করার অনুমতি পেতাম না। ভোর রাতে উঠে মেয়েরা শেলা নদীতে স্নান করে পুজোর জোগাড়ে লেগে যেত। তারা উপোস করতো বলে আমি লজ্জায় চা-বিস্কুট চাইতে পারতাম না সকালে। চুপচাপ মন্ডপে বসে পুজো দেখতাম। স্থানীয় বয়স্ক পুরুষেরা বাইরে গিয়ে পান খেতো কিংবা বাঁশের পাইপ টানতো। এদিকে মন্ডপে পুজো চলছে। পুরোহিতের পাশে বসে, এক সাধু চণ্ডীপাঠ করছেন। আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে মানুষেরা আসছেন যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে ঢাক  বাজাচ্ছেন বয়স্করা, বাচ্চারা খাসি ভাষায় গান গাইছে। প্রতিমার সামনের জায়গা পরিষ্কার করে নতুন নৈবেদ্য দিচ্ছে মেয়েরা। বাইরে ঢাকা জায়গায় চলছে রান্না। দুপুর বারোটা নাগাদ ভোগ। ভাত, লুচি, ডাল, ভাজা, সেদ্ধ, ৪-৫ রকম তরকারী, মাছ, পায়েস, মিষ্টি, এমনকি পানও। খাসিরা পান পাতায় চুন আর সুপুরি-টুকরো রেখে খায়। 

         সবার খাওয়া হলে মহিলারা নিজেদের ঘরে চলে যান। বাচ্চারা মন্ডপে বসে খেলে। কয়েকজন বয়স্ক বাইরে বসে গল্প করেন বাঁশের পাইপ মুখে ধুমপান করেন। বিকেলে আমরা কয়েকজন সাধু মিলে নদীতে যেতাম নৌকো ভ্রমণে। স্থানীয় লোকের নৌকো, তাঁরাই চালাতেন। ঘন্টাখানেক বেড়িয়ে সন্ধ্যায় আরতির আগেই ফিরতাম।  

          আরতিতে ধুনুচি নাচ শেখাতাম গ্রামের ছেলেদের। আর বিশ্বনাথ মহারাজ শেখাত ঢাক বাজানো। তারপর শুরু হতো নাচ-গানের অনুষ্ঠান। খোলা মঞ্চ, যার যা ইচ্ছে করো- আবৃত্তি, গান, নাচ, কৌতুক, গল্প...। একক ও সমবেত। সবাইকে অংশ নিতে হতো। কেউ না এলে হাত ধরে টানাটানি চলতো। মা দুর্গাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য সবাইকে কিছু-না-কিছু করতেই হবে। অনুষ্ঠানের পর রাতের খাওয়া। অনেক মহিলা নিজেদের ঘর থেকে কিছু নিয়ে আসতেন সাধুদের জন্য। 

         খেয়ে বাইরে এসে বসতাম একা। চারদিক অন্ধকার। সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শেলা নদী, বাকী তিনদিকে জঙ্গল। দূরে কোথাও লণ্ঠনের টিমটিম আলো। একেবারে নির্জন, শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক। এক-দেড় ঘন্টা বসে মন্ডপে ফিরে এসে চাতালে শুয়ে পড়তাম শতরঞ্চি পেতে। এভাবে সপ্তমী শেষ হতো। অষ্টমীর দিন অনেক লোক আসতেন চেরাপুঞ্জি শিলং গৌহাটি থেকে। নবমীর শেষে দশমী। যে মানুষদের কাঁদতে দেখি না সারা বছর, সেদিন তাঁদেরও চোখেও আসে জল। হঠাৎ যেন সব আনন্দ চলে গিয়ে একটা থমথমে পরিবেশ সর্বত্র। সকালে দর্পণ বিসর্জনের পর বিকেলে প্রতিমাকে তোলা হলো নৌকোয়। মাকে নিয়ে কয়েকটি নৌকো অনেকক্ষণ ঘুরে মাঝনদীতে  বিসর্জন। ফিরে শান্তিজল। একাদশীর দিন অনেকগুলি বাড়িতে নেমন্তন্ন থাকতো আমাদের। কোথাও চা, কোনো বাড়িতে চপ-কাটলেট, কিংবা পায়েস, ডাল-ভাত। এভাবেই কেটে যেত কয়েকটা দিন নতুন অভিজ্ঞতা ও আনন্দ নিয়ে।  আদিবাসীদের এই বিরল দুর্গাপুজো দেখে অবশেষে ফিরে  যেতাম চেরাপুঞ্জিতে।

    *স্বামী সোমেশ্বরানন্দ মহারাজের লেখা- “আদিবাসীদের দুর্গাপুজো” অবলম্বনে।

    *ছবিতে প্রতীকী হিসাবে শিলং রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গা পুজোর কুমারী ও দেবীকে দেখা যাচ্ছে।