বুধবার, নভেম্বর 25, 2020

আশা-আশঙ্কায় বুক বাঁধছে কুমোরটুলি
আশা-আশঙ্কায় বুক বাঁধছে কুমোরটুলি

আশা-আশঙ্কায় বুক বাঁধছে কুমোরটুলি

  • scoopypost.com - Sep 08, 2020
  • দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে বাঙালির মহোৎসব দুর্গাপুজো। দুর্গাপুজো মানেই জমজমাট এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পটুয়াপাড়া কুমোরটুলি। চারিদিকে শুধু মাটির সোঁদা গন্ধ আর স্টুডিও ভর্তি বড় থেকে ছোট প্রতিমা। কোনওটা প্রায় শেষ, কোনটির আবার কাঠামোতে মাটি লেপার কাজ চলছে। প্লাস্টিকের চাদরে সাবধানে ঢাকা দেওয়া মহার্ঘ প্রতিমা, ব্লো ল্যাম্পের শব্দ।  তবে এ বছর কুমোরটুলি মোটেই ভালো নেই। করোনাভাইরাস এসে কুমোরটুলিকে বুঝি পিছিয়ে দিল ২৫ বছর।

    অতিমারীর মধ্যেই এবার পুজো হবে বঙ্গে।পুজো আসতে এখন হাতে গোনা কয়েকটা দিনই বাকি। আগের বছরগুলোর মত পুজোর মাস ছয়েক আগে থেকেই সরগরম হয়ে ওঠে পটুয়াপাড়া। মাটি, বাঁশ, কাঠামো ঘিরে শিল্পীদের ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। কুমোরটুলি লেন ও দুর্গাচরণ লেনে পায়ে হাঁটা যায় না বায়নাদারদের ভিড়ে। এবার পুজোর ১ মাস আগেও সুনসান কুমোরটুলি। হাতে গোনা কিছু কাঠামোয় মাটি পড়েছে।উধাও সেই ব্যস্ততা। নেই বড় ঠাকুরের ভিড়। কুমোরটুলির বেশিরভাগ স্টুডিওতেই এখন চলছে একচালার প্রতিমা তৈরির কাজ। 

    প্রতিবছরই কলকাতার বড় পুজোর বায়না ধরেন কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী ইন্দ্রজিৎ পাল। এ বছরও সেকথা মাথায় রেখে ফেব্রুয়ারি মাসেই তিনটি বড় প্রতিমা প্রায় তৈরি করে ফেলেছিলেন। স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি একটা মাইক্রোস্কোপিক ভাইরাস তাঁকে লক্ষাধিক টাকার আর্থিক ক্ষতির সামনে ফেলে দিতে পারে। লকডাউনে পুজো নিয়ে সংশয় তৈরি হলেও পরে করোনাভাইরাসের প্রকোপ কিছুটা কমায় ফের আশায় বুক বেঁধেছিলেন ইন্দ্রজিৎবাবুর মত অনেকেই। কিন্তু উদ্যোক্তাদের তরফে তেমন কোনও সাড়া না পেয়ে কার্যত হতাশ তাঁরা। ইন্দ্রজিৎবাবুর কথায়, ‘মুখ্যমন্ত্রী যেদিন বলেছিলেন পুজো হবে, সেদিন ভেবেছিলাম সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই হবে। তবে এখন সেটা আর ভাবছি না। ফেব্রুয়ারিতে বড় ঠাকুর বানিয়ে রেখেছিলাম। যারা প্রতিবছর বায়না করে তাদের ৫০ শতাংশও এখনও আসেননি। যারা বায়না করেছেন সবাই ছোট একচালার ঠাকুরের জন্য। বুঝতে পারছি না কর্মচারিদের বেতন দিয়ে, নিজের পরিবারের খরচ চালাব কি করে।’   

    একই অবস্থা দুর্গাচরণ লেনের শিল্পীদেরও। ৩৫ বছর ধরে মৃন্ময়ী মা'কে চিন্ময়ী রূপদান করেন সোদপুরের বাসিন্দা বৈদ্যনাথ পাল। বছরের ৫ মাস কাটান এই কুমোরটুলিতেই। বাকি পাঁচমাস ঠিকা শ্রমিকের কাজ করেন। মার্চ থেকে কাজ বন্ধ। নেই রোজগার। ছোট মেয়ে মাধ্যমিক পাশ করে ১১ ক্লাসে ভর্তি হওয়ার জন্য তাকিয়ে রয়েছে বাবার রোজগারের দিকে। প্রতিমার গায়ে মাটি লাগাতে লাগাতে সেই কথাই জানালেন বৈদ্যনাথ বাবু। ‘প্রতিমা এবার সবই ছোট হচ্ছে, কিন্তু জানি না এর থেকে কত টাকা থাকবে। একটা প্রতিমা তৈরিতে লাগে এক গাড়ি মাটি। সবকিছুই তো এখন কিনতে হয়। তাই প্রতিমার দাম সঠিক পাব কিনা জানি না। দেবী যদি মুখ তুলে চান তাহলে হয়তো মেয়েকে ভাল স্কুলে ভর্তি করাতে পারব।’ চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে তাঁরা। 

    কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা অনবরত খেটে চলেছেন কিছু উপার্জনের আশায়। তাঁদের সঙ্গে যোগাড়ের কাজের খোঁজও করছেন বহু মানুষ। কাজের আশায় স্টুডিওগুলিতে ঘুরছেন প্রদ্যুৎ পালের মত শিল্পীরা। যাঁর মত অনেকেই ফি বছর পুজোর ৬ মাস আগে থেকেই কুমোরটুলির একজন হয়ে ওঠেন। এ বছরেও তাঁরা কাজ খুঁজতে এসেছেন কুমোরটুলিতে। ঘুরছেন এ স্টুডিও থেকে ও স্টুডিও। একবার নয়, বহুবার। ‘এই বছর সবাই ২-৩ জন কর্মী নিয়ে কাজ করছেন, তাই আমার কাজ জোটেনি। তাই খুঁজছি কেউ যদি রাখে। নাহলে খাব কী?’ আশঙ্কার রেখা প্রদ্যুতের মুখে। 

    কুমোরটুলি মানে শুধুই প্রতিমা নয়, কুমোরটুলি প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের উপার্জনের জায়গা। আজ সেখানে চরম দৈন্যতা। শিল্পীরা বলছেন, বর্তমানে প্রতিমার যা দাম, তা ছিল ২৫ বছর আগের দাম। এখন সেই দামেই বাধ্য হয়ে কাজ করছেন তারা। কিন্তু কোথাও কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে একটুকরো আলো এসে পড়েছে কুমোরটুলির অলিগলিতে। সেই আলো যেন মা'র বরাভয়। আশ্বাস দিয়ে বলছেন, 'ভয় কি রে, আমি তো আসছি'। আর সেদিকে তাকিয়েই এই দুঃসময় অবসানের স্বপ্নে বুক বাঁধছেন প্রদ্যুৎ বাবুরা। দেবীর বোধন তো হতেই হবে।