মঙ্গলবার, অক্টোবর 20, 2020

নারীশক্তির অদম্য প্রতিমা গান্ধীবুড়ি মাতঙ্গিনী

নারীশক্তির অদম্য প্রতিমা গান্ধীবুড়ি মাতঙ্গিনী

  • scoopypost.com - Oct 20, 2019
  • জয়সূর্য ঘোষ

    মাতঙ্গিনী হাজরা। একটি দৃষ্টান্তমূলক বিপ্লবী মহাজীবন। একটি জ্বলন্ত ইতিহাস। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন এই স্বতন্র সংগ্রামী মা। ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এই মহান বিপ্লবী নেত্রীর। ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তদনীন্তন মেদিনীপুর জেলার তমলুক থানার সামনে ব্রিটিশ-ভারতীয় পুলিশের গুলিতে তিনি মারা যান। তাঁর জন্ম ১৮৭০ সালের ১৯ অক্টোবর। পশ্চিমবঙ্গের তমলুকের হোগলায়। সাধারণ এক কৃষক ঠাকুরদাস মাইতির ঘরে। অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয় ত্রিলোচন হাজরার সঙ্গে। ১৮ বছর বয়সেই স্বামীকে হারান মাতঙ্গিনী হাজরা। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। আদতে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিতা। প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষাদীক্ষা তেমন ছিল না। ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর একনিষ্ঠ অনুসারী। সেইজন্য তাঁর আরেক পরিচয় গড়ে উঠেছিল `গান্ধী-বুড়ি` নামে। গান্ধীর আদর্শমতে, তিনি নিজের হাতে চরকা কেটে খাদি কাপড়ও বানিয়েছেন। ১৯০৫ সালে ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২২ সালের অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন। তার বিপ্লবী জীবন ছিল ক্ষুরধার। ব্রিটিশের লবণনীতির প্রতিবাদে তার লড়াই ছিল দুরন্ত। তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসেরও সদস্য ছিলেন। মৃত্যুর সময়ও তিনি কংগ্রেসের পতাকা উঁচু হাতে ধরেছিলেন। ভারতমাতার এই বীরাঙ্গনা নারী দেশের সম্মান মৃত্যুর পূর্বেও ভুলুন্ঠিত হতে দেন নি। ডান্ডি অভিযান, অসহযোগ আন্দোলন ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য।

    স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনে মেদিনীপুরের নারীদের যোগদান ছিল ইতিহাসে এক মাইলফলক ঘটনা। মাতঙ্গিনী হাজরা সে ইতিহাসেরই এক জ্বলন্ত বারুদ। তাই মেদিনীপুরে ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন আলাদা রূপ পেয়েছিল।

    ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কংগ্রেস সদস্যেরা মেদিনীপুর জেলার সকল থানা ও অন্যান্য সরকারি কার্যালয় দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা নেয়। উদ্দেশ্য ছিল জেলা থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। প্রধানত মহিলা স্বেচ্ছাসেবক সহ ছয় হাজার সমর্থক তমলুক থানা দখলের উদ্দেশ্যে একটি মিছিল বের করে। মরণপণ এই  মিছিলের নেতৃত্ব দেন মাতঙ্গিনী হাজরা।

    ভারতবাসীদের উদ্দেশ্যে বলা স্বামী বিবেকানন্দর একটি বাণী ওই সময়ে মাতঙ্গিনীকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছিল। স্বামীজি বলেছিলেন- ‘এখন থেকে আগামী পঞ্চাশ বছর তোমাদের একমাত্র উপাস্য দেবতা হবেন- জননী-জন্মভূমি। তার পূজো করো সকলে।’

    এ সময়টিতেই গান্ধীজি পরিচালিত আইন অমান্য আন্দোলনের (১৯৩০-৩৪) ঢেউ মেদিনীপুরেও আছড়ে পড়ে। বিপ্লবতীর্থ মেদিনীপুরের ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা তখন প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দাপটে। তিন-তিনজন জাঁদরেল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পেডি, গডলাস ও বার্জ প্রাণ হারিয়েছেন সন্ত্রাসবাদীদের হাতে। এক কথায় বলা যায়, এ সময় বিদেশী শাসককুল মেদিনীপুরের নাম শুনলেই বিশেষভাবে আতঙ্কিত ও দিশেহারা হয়ে পড়তেন।

    ১৯৩০ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে শুরু হল লবণ সত্যাগ্রহ আইন অমান্য আন্দোলন। দেশবাসীর পক্ষে সমুদ্র-জল থেকে লবণ সংগ্রহ করা তখন বেআইনি ছিল। দেশের যে যে জায়গায় লবণ তৈরির সুযোগ ছিল সত্যাগ্রহীরা সেইসব জায়গায় লবণ তৈরি করে আইন-অমান্য করতে লাগলেন। মেদিনীপুরের কাঁথিতেই প্রথম লবণ তৈরি শুরু হল। খবর পেয়েই পুলিশ গ্রামে ঢুকল। ঘর-বাড়ি সব জ্বালিয়ে দিল। নানান অত্যাচার শুরু করে দিল। তবুও মেদিনীপুর শায়েস্তা হল না। শাসককুল চাইল লবণ তৈরির একচেটিয়া অধিকার তাঁদের হাতে থাকুক। কিন্তু দেশের মানুষ চাইল লবণ তৈরির ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা।

    আইন অমান্য আন্দোলনে মাতঙ্গিনী ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। খবর পেয়েই পুলিশ এল। মাতঙ্গিনী গ্রেপ্তার হলেন। সঙ্গে রইলেন অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকরাও। তাঁরাও গ্রেপ্তার হলেন। এ দুর্ভোগ অবশ্য বেশিক্ষণ সইতে হয়নি। কিছুটা পথ হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে মাতঙ্গিনীকে ছেড়ে দেওয়া হল।

    পরবর্তী ঘটনা ঘটে ১৯৩৪-৩৫ সালের দিকে। অবিভক্ত বাংলার লাটসাহেব মি. অ্যান্ডারসন গোঁ ধরেছেন তমলুকে দরবার করবেন। হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড। মেদিনীপুরের বরাবরই রয়েছে বৈপ্লবিক ঐতিহ্য। মেদিনীপুরবাসীরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লাটসাহেবকে এই দরবার তারা কিছুতেই করতে দেবে না। মেদিনীপুরবাসীরা দেখিয়ে দিতে চায় যে তাঁরা আর কিছুতেই ইংরেজদের গোলামি করতে রাজি নয়। এদিকে ইংরেজ সরকারও তাঁদের সংকল্পে অটল। ফলে অনিবার্য হয়ে ওঠে সংঘাত।

    লাটসাহেব এলেন জেদের বশে। তমলুকে দরবার তিনি করবেনই। দরবার বসার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ।  পুলিশ ও প্রশাসনের বেপরোয়া মনোভাব। এমন সময় হাজার কণ্ঠে ধ্বনি উঠল ‘লাটসাহেব তুমি ফিরে যাও- ফিরে যাও।’ বন্দে মাতরম ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল আকাশ বাতাস।

    শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল দরবারের দিকে। শত শত পুলিশও হাজির। হাতে তাঁদের লাঠি ও বন্দুক। শোভাযাত্রীদের পথ আটকাল ওই পুলিশবাহিনী। পুরোভাগেই ছিলেন মাতঙ্গিনী। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করল। এবার কিন্তু তাকে আর এমনিতে ছেড়ে দেওয়া হল না। রীতিমতো বিচার হল। মাতঙ্গিনী দুমাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। বিচারের রায় ঘোষণার পর হাসিমুখে বললেন, ‘দেশের জন্য, দেশকে ভালোবাসার জন্য দণ্ডভোগ করার চেয়ে বড়ো গৌরব আর কী আছে?’

    মূলত, মাতঙ্গিনীকে অমর করে রেখেছে ১৯৪২ সালের আগস্ট বিপ্লব। ১৯৩৮ সালের জুলাই মাসে দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র ‘ভারত ছাড়ো’ ধ্বনি দিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে গান্ধীজিকে অনুরোধ করেন। কিন্তু দেশ প্রস্তুত নয় অথবা অন্তর থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছি না বলে গান্ধীজি চার বছর বৃথা দেরি করে ফেললেন। অবশেষে ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট ওই আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে গান্ধীজি ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেন।

    দেশনায়ক সুভাষচন্দ্রের প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হল গান্ধীজির আবেগ। শৌর্য ও অহিংসা একসূত্রে গাঁথা হয়ে যাওয়ায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারা এক নতুন মাত্রা পেয়ে যায়।

    ১৯৪২-এর ২৯ সেপ্টেম্বর। আগস্ট বিপ্লবের জোয়ার তখন মেদিনীপুরে আছড়ে পড়েছে। ঠিক হয়েছে এক সঙ্গে তমলুক, মহিষাদল, সুতাহাটা ও নন্দীগ্রাম থানা আক্রমণ করে দখল করে নেওয়া হবে।

    মাতঙ্গিনী স্বেচ্ছাসেবকদের বোঝালেন গাছ কেটে ফেলে রাস্তা-ঘাট সব বন্ধ করে দিতে হবে। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের তার কেটে দিতে হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে হবে। পাঁচদিক থেকে পাঁচটি শোভাযাত্রা নিয়ে গিয়ে তমলুক থানা এবং একই সঙ্গে সমস্ত সরকারি অফিস দখল করে নিতে হবে।

    যেমন কথা তেমনি কাজ। ২৯ সেপ্টেম্বর পাঁচটি দিক থেকে পাঁচটি শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল তমলুক অধিকার করতে। হাজার হাজার মেদিনীপুরবাসী শামিল হয়েছিলেন ওই শোভাযাত্রায়। হাতে তাঁদের জাতীয় পতাকা। মুখে গর্জন ধ্বনি ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো- করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে- বন্দে মাতরম্।’

    পশ্চিমদিক থেকে এগিয়ে এল আট-দশ হাজার মানুষের এক বিরাট শোভাযাত্রা। গুর্খা ও ব্রিটিশ গোরা সৈন্যরা তৈরি হল অবস্থার মোকাবিলার জন্য। হাঁটু মুড়ে বসে গেল তাঁরা। তারপরই তাঁদের বন্দুকগুলো গর্জে উঠল। মারা গেলেন পাঁচজন। আহত হলেন আরও বেশ কয়েকজন।

    উত্তর দিক থেকে আসছিল মাতঙ্গিনীর দলটি। তাঁরা থানার কাছাকাছি আসতেই পুলিশ ও মিলিটারি অবিরাম গুলিবর্ষণ শুরু করে দিল। বিদ্রোহীদের মধ্যে থেকে বেশ কয়েকজন কিছুটা পিছু হঠে গিয়েছিল। তাঁদের সতর্ক করে দিয়ে মাতঙ্গিনী বললেন, ‘থানা কোন্ দিকে? সামনে, না পেছনে? এগিয়ে চলো। হয় থানা দখল করো, নয়ত মরো। বলো, ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’-‘বন্দে মাতরম্।’

    বিপ্লবীদের সম্বিত ফিরে এল। তাঁদের কণ্ঠেও ধ্বনিত হতে থাকল, ‘এগিয়ে চলো। ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো। ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে, বন্দে মাতরম্।’ আবার এগিয়ে যেতে লাগল তাঁরা উদ্দাম বেগে। ওদিকে গুলি বর্ষণ শুরু হয়ে গেল বৃষ্টির মতো।

    মাতঙ্গিনী দলটির পুরোভাগে। ছুটে চলেছেন উল্কার বেগে। বাঁ-হাতে বিজয় শঙ্খ যেন পাঞ্চজন্য, ডান হাতে জাতীয় পতাকা। আর মুখে ধ্বনি- ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো-করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে-বন্দে মাতরম্।’

    একটি বুলেট পায়ে লাগতেই হাতের শাঁখটি মাটিতে পড়ে গেল। দ্বিতীয় বুলেটের আঘাতে বাঁ-হাতটা নুয়ে পড়ল। কিন্তু ওই অবস্থাতেও ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ভারতীয় সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বলে চলেছেন, ‘ব্রিটিশের গোলামি ছেড়ে গুলি ছোঁড়া বন্ধ করো- তোমরা সব আমাদের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে হাত মেলাও।’ প্রত্যুত্তরে উপহার পেয়েছিলেন কপালবিদ্ধ করা তৃতীয় বুলেটটি। প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু জাতীয় পতাকাটি তখনও তাঁর হাতের মুঠোয় ধরা। সেটি কিন্তু মাটি স্পর্শ করেনি কারণ মরতে মরতেও তিনি চিৎ হয়ে পড়লেন আর পতাকা রইল তাঁর বুকের উপর। কপালের লাগা গুলির ক্ষতস্থান দিয়ে বেরোনো রক্তে তখন সারা শরীর ভেসে গেছে। নিথর দেহে অপলক দৃষ্টিতে যেন চেয়ে আছেন ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতের প্রত্যাশায়!

    সেদিন মাতঙ্গিনী হাজরার মৃত্যুবরণের দৃষ্টান্তটিকে সামনে রেখে মানুষকে বিপ্লবের পথে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলো তখন  অসংখ্য স্কুল, পাড়া ও রাস্তার নাম মাতঙ্গিনী হাজরার নামে উৎসর্গ করা হয়। স্বাধীন ভারতে কলকাতা শহরে প্রথম যে নারীমূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছিল, সেটি ছিল মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি। ১৯৭৭ সালে কলকাতার ময়দানে এই মূর্তিটি স্থাপিত হয়। কলকাতার ময়দান অঞ্চলে মহান বিপ্লবী মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি এখনো তার শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    তমলুকে ঠিক যে জায়গাটিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেই জায়গাটিতেও তার একটি মূর্তি আছে। ২০০২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ভারতের ডাকবিভাগ মাতঙ্গিনী হাজরার ছবি দেওয়া পাঁচ টাকার পোস্টাল স্ট্যাম্প চালু করে।

    পরিবর্তন হয়েছে অনেক। তমলুক-মেচেদা রোডে কাঁকটিয়া বাজার থেকে আলিনান গ্রামের পূর্বপাড়া পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা মোরাম থেকে ঢালাই হয়েছে। বসেছে স্ট্রিট লাইট। ট্রেকার, টোটোয় চেপে পৌঁছে যাওয়া যায় মাতঙ্গিনীর বাড়িতে। দোতলা মাটির বাড়ি। তবে রাস্তার মোড়ের আবক্ষ মূর্তি, শহিদ বেদি ছাড়া আর কিছু দেখে মাতঙ্গিনীর বাড়ি চেনার উপায় নেই। তাঁর বাপ-ঠাকুরদা আর স্বামী-শ্বশুরের ভিটেয় গিয়ে দেখা গেল, অগোছালো ছবির মতো দুটো গ্রাম। হোগলা আর আলিনান। একটু যত্ন নিলেই পূণ্যতীর্থের মতো পর্যটক টানত তমলুকের এই দুটো জায়গা।

    ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গান্ধীবুড়ির আত্মবলিদানের পর ৭৭ বছর কাটলেও তাঁকে নিয়ে সে ভাবে চর্চা বা কোনও সংগ্রহশালা কেন তৈরি হল না, জানেন না তাঁর পরিবারের বর্তমান সদস্যরা। বর্তমান প্রজন্ম, সাধারণের কাছে তিনি শুধুই স্বাধীনতার শহিদ। বিশেষ দিনে স্মরণের পর বেমালুম ভুলে যাওয়া। এই নিয়ে ক্ষুব্ধ মাতঙ্গিনীর পরিবার। শহিদ পরিবারের চতুর্থ প্রজন্ম, বছর ৭৩-এর মদনমোহন হাজরা নিজের উদ্যোগে বাড়ির বাগানে মাতঙ্গিনীর মূর্তি তৈরি করিয়েছেন। বাড়ি লাগোয়া জমিও দিয়েছেন সংগ্রহশালার জন্য। তবু সেই কাজ কেন হয়নি, জানেন না তিনি। মদনমোহন বলেন, 'স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনে অন্য মহিলাদের নিয়ে মাটির যে কুঁড়েতে তিনি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, সেটা আর নেই। মাতঙ্গিনী যে কোনও নারীর থেকে কম ছিলেন না। শুধু মূর্তি, স্তম্ভ তৈরি করলে মানুষ তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবেন না।' মুগবেড়িয়া কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও গবেষক হরিপদ মাইতি বলেন, 'আমাদের উত্তর পুরুষের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবন, আদর্শ নিয়ে চর্চা করতে পারিনি। তাই বর্তমান প্রজন্ম তাঁদের নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্যে দায়ী আমরাই।'

    বর্তমানে হাজরা পরিবারের সদস্য ৪০ জন। তাঁরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হাতে গোনা এক দু'জন। মদনমোহন বললেন, 'মাতঙ্গিনী ছিলেন আমার বাবার ঠাকুমা। বাবার মুখে তাঁর অনেক কথা শুনেছি। যা আজও অনেকের অজানা।' তিনি বলেন, 'বাবার মৃত্যুর পর বেলুন গ্রামের বাড়ি ছেড়ে হোগলাতে মামার বাড়ি এসে থাকতেন মাতঙ্গিনী। মামার কোনও ছেলে ছিল না। ৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে আলিনানে শ্বশুরবাড়িতে চলে আসেন। এখান থেকেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন। আলিনান তাঁর বাসস্থান এবং কর্মক্ষেত্র।' তাঁর আক্ষেপ, দু-একজন মাতঙ্গিনীর কাজকর্ম সম্পর্কে সামান্য কিছু জানেন। তাঁদের মৃত্যুর পর আর কেউ কিছু জানাতেই পারবেন না।' মাতঙ্গিনীকে নিয়ে তাই বই লেখার চেষ্টা করছেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রথম সারির নেতারা আলিনানে এসে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে বাড়ি সংস্কার বা সংগ্রহশালা গড়ে তোলার কাজ এখনও শুরু হয়নি। শহিদ মাতঙ্গিনী স্মৃতিরক্ষা কমিটির অন্যতম সদস্য বিভাস কর বলেন, 'সংগ্রহশালা তৈরি হলে তাঁর জীবন ও কাজকর্ম অনেকে জানতে পারবেন।' স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য যতীন্দ্রমোহন হাজরা বলেন, 'রাজ্যে পালাবদলের পর এই এলাকায় প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। ঢালাই রাস্তা, আলো পৌঁছে গিয়েছে গ্রামে। রাস্তার নাম দেওয়া হয়েছে মাতঙ্গিনীর নামে। সংগ্রহশালা তৈরির কাজও শুরু হবে খুব শীঘ্রই।'