বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 22, 2020

কুমারী মেয়ের জীবনের গল্প ‘টুসু’

কুমারী মেয়ের জীবনের গল্প ‘টুসু’

  • scoopypost.com - Jan 14, 2020
  • চল টুসু খেলতে যাবো রানিগঞ্জের বটতলা

    অমনি পথে দেখাই আইনব কয়লাখাদের জল তুলা

    উলোট পালট ফুলুট বাঁশিতে

    আমার মন মানে না ঘরেতে ...

    রাঢ় বাংলার ঘরের মেয়ে টুসু। তাকে নিয়ে যত আনন্দ, গান, উৎসব। রাঢ় সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ টুসু উৎসব আসলে মানুষের জীবনের কথা। জীবনের গান। অনার্য সংস্কৃতির অঙ্গ।

    টুসু পুজোয় নেই কোনও মন্ত্র।কারণ, এ উৎসব যে রাঢ় বাংলার আদিবাসীদের। কুমারী টুসুর পুজো করে কুমারী মেয়েরা। মন্ত্রর বদলে ছড়া বাঁধে তারা। যাতে থাকে জীবনের সুখ, দুঃখ, পাওয়া, না-পাওয়া। সেই ছড়ায় সুরও দয়ে তারাই।সেই সুরেও আছে নিজস্বতা। এই নিজস্বতা নিয়েই পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়খণ্ড, বীরভূম, ঝাড়গ্রামের আদিবাসী মহলে একমাস ধরে পালন হয় টুসু উৎসব বা পরব।

    তবে অনার্যদের এই উৎসবে পাওয়া যায় বিজ্ঞানের ছোঁয়া।খুঁজে নেওয়া যায় জীবনকে।

    টুসু নিয়ে নানা জনের নানা মত। কেউ বলেন, টুসু শব্দটি এসেছে ধানের তুষ থেকে।তুষ দিয়েই এই পুজোর ডালি সাজানো হয়। আবার কারও মতে টুসু হল টুই+সু। কুড়মালিতে টুই শব্দের অর্থ হল সর্বোচ্চ ও সু হল সুরুজ বা সূর্য। অর্থাৎ প্রকৃতির শক্তির সর্বোচ্চস্থান। যা ছাড়া জীবন অচল। এই শক্তিতেই হয় কৃষিকাজ।

    অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিন থেকে পৌষ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত রাঢ় বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে পূজিত হন টুসু। কোথাও পুজো হয় মাটির মূর্তি। কোথাও মূর্তি ছাড়াই। নতুন আমন ধান মাথায় করে এনে খামারে রাখা হয়। অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির সন্ধেয় কুমারী মেয়েরা একটি পাত্রে চালের গুঁড়ো লাগিয়ে তাতে তুষ রাখে। তারপর তুষের ওপর ধান, বাছুরের গোবর, দূর্বা ঘাস, আলু, চাল, আকন্দ, বাসক ফুল, কাচ ফুল, গাঁদা ফুলের মালা রেখে পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ লাগিয়ে তা দেবী হিসেবে পুজো করা হয়।

    কিন্তু এ পুজার কোনও মন্ত্র তন্ত্র নেই। নেই নির্ধারিত ক্রিয়া-কর্ম। ব্রাহ্মণেরও প্রয়োজন নেই অনার্যদের পুজোয়। টুসুর সামনে গ্রামের মেয়েরা সুর করে গান করে। সেই গানে থাকে জীবনের সাধ আহ্লাদ, আশা নিরাশা, ঠাট্টা-তামাশার কথা।

    “আমার টুসু মুড়ি ভাজে, চুড়ি ঝনঝন করে গো
    উয়ার টুসু হ্যাংলা মাগি, আঁচল পাইত্যে মাগে গো”।

    গ্রামের মেয়ে যদি শহরে যায় তাহলে শহরু হাওয়া লাগে তার। তখনই গান হয়...

    “না রহিবেন গাঁয়ে টুসু যাবেন ইবার শহরকে
    আলতা চরণ জুতায় ঢেকে দিবে না পা ডহর কে
    গীত গাহিবেন অবাক কলে , পান কিনিবেন দোকান লে”

    পৌষ মাসের শেষ চারদিন চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর ও আখান নামে পরিচিত। চাঁউড়ির দিনে গৃহস্থ বাড়ির মেয়েরা উঠোন গোবরমাটি দিয়ে নিকিয়ে পরিষ্কার করে। বাঁউড়ির দিন বিশেষ পিঠে করে তারা যা গড়গড়্যা পিঠে বা বাঁকা পিঠে বা উধি পিঠে ও পুর পিঠে নামে পরিচিত। বাঁউড়ির রাত দশটা থেকে টুসুর জাগরণ হয়। মেয়েরা জাগরণের ঘর পরিষ্কার করে ফুল, মালা ও আলো দিয়ে সাজায়। এই রাতে কিশোরী কুমারী মেয়েরা ছাড়াও গৃহবধূ ও বয়স্কা মহিলারাও টুসু গানে অংশগ্রহণ করেন। এই রাতে টুসু দেবীর ভোগ হিসেবে নানারকম মিষ্টি, ছোলাভাজা, মটরভাজা, মুড়ি, জিলিপি থাকে।

    একটা মাস টুসুর সঙ্গে গান-বাজনা, খাওয়া-দাওয়া একসঙ্গে করতে করতে কোথাও যেন পরিবারের কেউ হয়ে যায় টুসু। কোল, মুন্ডা, ওরাওঁ, সাঁওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ, ভুঁইয়া, কুর্মি, বাউড়ি, বাগদি মহিলারা এই পুজো করেন।একমাস পরে যখন রঙিন কাগজের চতুর্দোলায় টুসু বসিয়ে নদীতে ভাসাতে যাওয়া হয় তখন মনে থেকে যায় বিষাদের সুর।

    তবে অনার্যদের এই উৎসবে বিজ্ঞান যোগ রয়েছে বলেই মত অনেক আদিবাসী সংস্কৃতির গবেষক।কারও মতে পৌষের শেষদিনে টুসুর জলে ভাসান হল আসলে অঙ্কুরোদগমনের সূচনা।টুসু কুমারী মেয়ে। ভাসানের দিন যদি ধরা হয় তাকে জলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হল তাহলে তারপর তার সন্তানসম্ভবা হওয়ার দিনক্ষণ আসন্ন হয়।

    টুসু মানে যদি ধান বা শস্য হয়, তাহলে জলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় পৌষের শেষ দিন। মাঘে টুসু গেল শ্বশুরবাড়ি। মাঘেই শুরু হয় হলকর্ষণ। আড়াই পাক হাল চালিয়ে কৃষির সূচনা। তারপর পালা আসে বীজ ছড়ানোর পালা। তারপর সময়ে বৃষ্টি হয় তাহলে সহজেই চারা তৈরি হবে।মাঘ থেকে যদি আশ্বিনের শুক্লপক্ষ ধরা হয় তাহলে সময়টা দাঁড়ায় মোটামুটি ন’মাস। অর্থাৎ গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়। এ সময় ফসল পাকে। আর তারপরই শুরু হয় ফসল কাটার পালা। তাই এ যেন এক মেয়ের কুমারী থেকে যৌবনবতী হয়ে সন্তান প্রসবের গল্প।