রবিবার, অক্টোবর 25, 2020

মেঘমিনার মায়াপাহাড় ঝুলবারান্দা

মেঘমিনার মায়াপাহাড় ঝুলবারান্দা

ফটো ক্রেডিট : স্মৃতিকণা সামন্ত

  • scoopypost.com - Oct 13, 2019
  •  

    বক্সাদুয়ারের লেপচাখা গ্রামে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত পাহাড়ি এই গ্রামটি। কখনও রোদ ঝলমলে দুপুরের আকাশে হঠাৎই উড়ে আসা মেঘের চাদর, ক্ষণিকের জন্য ঢেকে দিয়ে যায় লেপচাখাকে। নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে সান্তালবাড়ি। স্টেশন থেকেই গাড়ি মিলবে বক্সা দুর্গে যাওয়ার। ভিউ পয়েন্ট পর্যন্ত গাড়িতে এসে ৩ কিলোমিটার পাহাড়ি পথে ট্রেক করে ইতিহাসের বক্সা দুর্গে। দুর্গ যাওয়ার পথেই পড়ে সদর বাজারে একটু জিরিয়ে নেওয়া। চা-মোমো খেয়ে একটু চাঙ্গা হয়ে আবার হাঁটা বক্সা দুর্গের উদ্দেশ্যে, যেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি করে রাখা হত। দুর্গের পরে হেঁটে একঘন্টা লাগে লেপচাখা গ্রামে পৌঁছতে। ছোট্ট গ্রামটিতে রয়েছে একটি বৌদ্ধ গুম্ফা। সঙ্গে অনাবিল নিসর্গ। লিখছেন স্মৃতিকণা সামন্ত...

    গল্পেরা জিরোচ্ছে গাছতলায়,এস খানিক হাঁটি।এই যে চড়াই উতরাই এলোমেলো, এপথের শেষে বিষণ্নতা অপেক্ষা করে আছে,জড়িয়ে নেবে বলে।বয়সবিহীন গাছেদের গায়ে শ্যাওলার নিশ্চিন্ত আশ্রয় ,প্রতিটি গাছের কোটরে দুঃখ জমা আছে,তোমার ভিতরে জমাট দুঃখদের ছুঁতে চেয়ে....।

    এস হাঁটি,ঐ যে অলীক কুয়াশা আস্তরণ,রিমঝিম বৃষ্টিবিলাসে মেঘমল্লার দিন এসবই তোমার অপেক্ষায়,না জানি কত সহস্রবছর,তোমারই পথ চেয়ে শিকড়ে শিকড়ে লিখে রাখা প্রতীক্ষার দিনলিপি।

     

    হাঁটছি এক পাহাড়ি পথে,এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তায়,পাহাড়ের গা ঘেঁষে,নাকে এসে লাগছে সোঁদা গন্ধ,ভিজে মাটির নিঃশ্বাস,বুনোফুল ভেজা পাতা টুপটাপ ভিজিয়ে দিচ্ছে দিন,হঠাৎ বুঝি অন্ধকার ঘিরেছে দুহাতে....বৃষ্টিমুখর অরণ্য, পাহাড়,পাকদন্ডী পথ।

    আমি জানি প্রতিটি বৃষ্টিফোঁটার নিজস্ব গল্প থাকে,থাকে রূপকথার রঙ,তাকে চিনতে গেলে মাখতে হবে,ডুবতে হবে,ভিজতে হবে সমর্পণের মত।

    পেরিয়ে যাচ্ছি টুকটাক ঘরবাড়ি,নকশাকাটা বাগান,ফুলবারান্দা.....জলছবির কথামালা ।

    ঘন মেঘের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে অলকাপুরীর বাসিন্দা মনে হয়।পেরিয়ে যাচ্ছি ঝোরা,কাঠের সাঁকো,হঠাৎ বৃষ্টিতে উৎসবের শব্দ ঝোরার বুকে,নাচের তালে ছুটে চলা এক অনায়াস গতি....সে তো তোমাকেও ভাবায়,ময়ূরীর ইশারার মত।পাহাড়ের খাদে গভীর গভীরতর খাঁজে বনস্পতির বসত, মাথায় তাদের মেঘমিনার,এলোমেলো...অগোছালো । 

    ওই যে বাঁদিকে ছেড়ে যাচ্ছ ভগ্নস্তূপ,মেঘের চাদরে জড়ানো,ওখানে অনেক শব্দ জমে আছে,ইতিহাস শুয়ে আছে গুঁড়ি মেরে শামুক খোলসে। বক্সা দুর্গের কথা ...সে এক অন্য পথ,অন্যকোন দিন। 

    হাঁটছি,হাঁটতে হাঁটতে থামা....চা তো আছিলা ,আসলে আত্মীয়তার ঝুরি বুড়ো বটের ডালে,এর কাছে বোসো খানিক,সুখের কথা সবাই জানে,আজ দুঃখের কথা শোন।দুঃখ বড় আপন করে নেয়।

    পাহাড় কি দুঃখ ছুঁতে পারে....? দুঃখরেনু জল সব গড়িয়ে গেছে খাদে ,এখানে অরণ্য মানে গভীর জীবন,ঝুম বর্ষায় অরণ্যের কনসার্ট,পাখির সুর, পোকার কিট কিট ,ভেজা পাতার সরসর এসবের পরতে আদিম গন্ধ থেমে থাকে ,মাঝে মেঘ বসে থাকে কোনো পাহাড়ি পাথরে,বোঝাপড়া করে.....এসময় নস্যাৎ সব চাওয়া পাওয়া।পৃথিবীর আদিমতম ক্ষণে ফিরে যাওয়াই একান্ত পরিণতি। 

    কাঞ্চার মুখে গল্প বাহার।এগিয়ে গেছে অনেক দূর... পিছনে চলেছি...সবার শেষে।নিজেকে নিঃস্বতায় মিলিয়ে দিতে দিতে....এক অকারণ আবেগে নিজের ভিতরে জমা করেছি বৃষ্টিসুখ....এসময় মৃত্যুকে বড় আপন মনে হয়,বাঞ্ছিত মৃত্যুবিলাস জীবনের বিপরীতে এসে দাঁড়ায় সেসময়।

    সামনে খাড়া পথ পাথুরে,পিছল।

     উঠতে উঠতে বাড়ি,বাড়ির কোনে ফুল, প্রার্থনা পতাকার সাদা...এলোমেলো মুখ।পৌঁছেছি এক অনাবিল অপার্থিব দেশে,লেপচাখা....আজ এটুকুই থাক,বর্ষণস্নিগ্ধ দিন ভরে থাক মেদুর আকাশ যাপনে..... 

    ........ফিরে যাব সতত ঘুমের দেশে।

    সমস্ত শব্দের চাষ থেমে যাবে একটি ইঙ্গিতে

    ডেকোনা সেদিন।বিবর্ণ আলমারির ভাঁজে

    বিশ্রাম নেবে স্মৃতিসুখ, অম্লান আশ্বিন কিংবা হেমন্ত দুপুরে থেমে যাবে

    সব যাতায়াত। তুমিও থামবে খানিক

    ধুলোমুঠি ঋণভার পড়ে থাক

     আলতো অচেনায়।

    শুধু যাওয়াটুকু রেখে যাব

    একটি বিস্মৃত পথে ভুল ঠিকানায়।.. 

     

     আলগোছে পড়ে থাকা এক ঝুলবারান্দা এতখানি হৃদয় অধিকার করতে পারে,একথা জানতে তুমি?

    বৃষ্টি-তাথৈ পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি।বাড়ি মানেই একলা ছাদের কোন,বাগান আলো ফুল,একটুখানি ওম আর আদুরে বিড়াল।বাড়ি মানেই অঝোর বৃষ্টিপাত ,একলা ভিজে যাওয়া,বাড়ি মানেই বারান্দাতে নিজস্ব অধিকার।

    সামনে দোদুল গাছ,সবুজ ছুপানো একফালি মাঠ খোলা জানালার মত, বনভূমি দিগন্ত বিস্তার যতদূর চোখ,নীচে,নদীপথ  সারি সারি তারই মাঝখানে সহজ অধিকারে।

    পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মেঘদের বিশ্রাম-বাড়ি। মেঘ জিরোয়,গল্প করে,সুখ দুঃখ শুকোতে দেয় গাছেদের গায়ে। তারপরই হঠাৎ ওড়াউড়ি,পরিব্রাজন পাহাড় উপত্যকায়। সামনে তখন সবজে জাজিম মাঠ আর এক অলীক-সবুজ কাঠবাড়ি।

    গোটা পঞ্চাশ ঘরবাড়ি,শ দুই মানুষ জন,এক চোর্তেন আর দ্রুকপা সমাজ দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে।ফুরফুরে রোদের সকালে এখানে প্রজাপতির জলসা ,ফুলেদের রংবাহার। তবুও কঠিন জীবন,কঠিনতর বাঁচার লড়াই.....স্বাস্থ্য,শিক্ষা,ন্যূনতম সুবিধা..সব অভাব আঁচলে বেঁধে এখানে জীবন গান গায়,সুর মেলায় মেঘের মূর্ছনায়,রোদ্দুরের গানমেলায়।সংযত চাহিদায় ছন্দে আঁকা জীবনের ছবি। 

    সারাদিন বৃষ্টিবিলাপ ,মেঘ নেমে আসে মনখারাপের বারান্দায়। বেলা গড়ায়। ঢিমেতালে ফুরিয়ে আসে আলো,অন্ধকারের রঙ ঘন নীল। এস,স্তব্ধতায় ফিরে যাই। প্রতিধ্বনিহীন শব্দেরা ঘুমাক জোনাকি হৃদয়ে।

    ধীরপায়ে ভোর আসে বিশুদ্ধ মন্ত্রের মত, পাখির ডানায় রোদ ।বুনচু ,ছিরিং এর ছোট্ট ছোট্ট পায়ে স্কুলছুটির ব্যস্ত জীবন,খুশিয়াল এক সকাল...মেঘভাঙ্গা আলো। সবুজ ঢালে পান্না গলানো সুখ।

    এপাহাড় মগ্ন এখন ,দুহাতে মেখেছে মেঘ আদর,রোদ নিশান,কুয়াশা পরত।এস থামি,এই সব শাশ্বত ভোরের কাছে নতজানু হই.....এ জীবনে যতটুকু চাওয়া তার চেয়ে ঢের বেশি পেয়েছে হৃদয়। 

    ঘুমন্ত সব অলিগলি বেয়ে হাঁটা ...একা..এক নিজস্ব সকালে, নাম চিনি,পথ খুঁজি, সংসারী উঠোনে এসে দাঁড়াই....অচেনার পরিচয় যত,দুহাতে আত্মীয়তার দাবি,তুলে আনি হিসেবে কৌটায়,জমা রাখি...কোন এক অবসরে বৃষ্টিবিরল দিনে ছড়াব এসব আত্মীয়তার বীজ রিক্ত বাগানে। 

    এলোমেলো দিন কেটে যায় অবসরে,আলস্যে,পায়ে পায়ে পথ,একটুখানি উঠোন তারই মাঝে বেড়ে ওঠে গল্পের গাছ.....মানুষেরা আসে যায় পরিযায়ী পাখির মতন,আমারও উড়াল সেদিন এ পাহাড় এই মেঘ এ সবুজ ভালবেসে। নশ্বর জীবনের মানে ভরে ওঠে আলোছায়া দিনে কোন এক নিবিড় বিকেলে। 

    সন্ধ্যা নামে,নীল নির্জন পাহাড়ের কোলে স্তব্ধতা দাঁড়ায় এসে।ঐখানে দিবা অবসান একান্ত নিয়মে। অন্ধকার গূঢ়তর হয়....থেমে যায় সব যাতায়াত। তারা ফুটে ওঠে আকাশ সামিয়ানায়,ঝিকিমিকি আলো,এমন নির্জন কবে দেখেছি আমি?এমন অলৌকিক আলোক উছ্বাস?

     এমন গহীন রাতে পৃথিবীকে দূরতর মনে হয়

    আলো নেই,ছায়া নেই

    অলীক আকাশ জুড়ে নিঃশব্দ বিস্ময়

    নক্ষত্রের দূরাগত আলো ছড়িয়েছে জোনাকী ডানায়

    না বলা জিজ্ঞাসা যত ছিল অর্থ খুঁজে পায়

    এইখানে এসে,অবশেষে।.............