বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 29, 2020

ধন তেরসের তাৎপর্য ও নেপথ্য কাহন

ধন তেরসের তাৎপর্য ও নেপথ্য কাহন

  • scoopypost.com - Oct 24, 2019
  • জয়সূর্য ঘোষ

    কথাটি হল-ধনতেরস! অর্থাৎ ধনলক্ষ্মী ত্রয়োদশী। মূলত উত্তর পশ্চিম ভারতীয় অর্থাৎ গুজরাটি বা মারোয়ারি সম্প্রদায়ের এটি একটি মাঙ্গলিক উপাচার। কয়েক বছরে বাজার ঘুরে এই বাংলায় জাঁকিয়ে বসেছে এই ধনতেরস। মানুষের বিশ্বাস কার্তিক মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিনে ঘরে সোনা বা মূল্যবান দ্রব্য ক্রয় করে আনলে সংসারে লক্ষ্মীশ্রী বৃদ্ধি হয়। এরফলে পশ্চিম ভারতের জাভেরী বাজারের স্বর্ণকাররা যেমন উঠেপড়ে লাগত তেমনি সাধারণ মানুষও মেতে উঠত এই কেনাকাটায়। এই প্রথা এখন বাংলার ঘরে ঘরে প্রচলিত। তাই অন্য অনেক সংস্কারের মতন ধনতেরসের হাত ধরে যেন গোটা জাভেরী বাজারটাই উঠে এসেছে বউবাজার বা বাংলার সোনার দোকানগুলিতে।

    দীপাবলী বা দিওয়ালি মূলত পাঁচ দিনের উৎসব। এরই একটা অঙ্গ হল ধনতেরস যার আরেকটি নামও আছে— ধনত্রয়োদশী বা ধনবত্রী ত্রয়োদশী। ‘ধন’ শব্দের মানে সম্পত্তি। ত্রয়োদশী শব্দের অর্থ হিন্দু ক্যালেন্ডারের কৃষ্ণ বা শুক্ল পক্ষের ১৩তম দিন। দীপাবলীর সময় লক্ষ্মীপুজোর দিন দুই আগে ধনতেরস পালিত হয়। বলা হয়, ধনতেরসের দিন দেবী লক্ষ্মী তাঁর ভক্তদের গৃহে যান ও তাঁদের ইচ্ছাপূরণ করেন। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে এই দিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা এ দিন দামী ধাতু বা বস্তু কেনেন। সম্পদের দেবতা কুবেরও এদিন সমানভাবে পূজিত হন।

    কথিত আছে, রাজা হিমার ১৬ বছরের ছেলের উপর এক অভিশাপ ছিল। তাঁর কুষ্টিতে লেখা ছিল যে, বিয়ের চার দিনের মাথায় সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হবে। তাঁর স্ত্রীও জানত সেই কথা। তাই সেই অভিশপ্ত দিনে সে তাঁর স্বামীকে সেদিন ঘুমোতেই দেয়নি। শোয়ার ঘরের বাইরে সে সমস্ত গয়না ও সোনা-রূপার মুদ্রা জড়ো করে রাখে। সেই সঙ্গে সারা ঘরে বাতি জ্বালিয়ে দেয়। স্বামীকে জাগিয়ে রাখতে সে সারারাত তাঁকে গানে-গল্পে মাতিয়ে রাখে। পরের দিন যখন মৃত্যুর দেবতা যম তাঁদের ঘরের দরজায় আসে, তখন আলো আর গয়নার জৌলুসে তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে যায়। রাজপুত্রের শোয়ার ঘর পর্যন্ত তিনি পৌঁছান ঠিকই। কিন্তু দরজার গোড়ায় সোনার স্তুপের উপর বসে গল্প আর গান শুনেই তাঁর বাকি রাত কেটে যায়। সকালে লগ্ন বয়ে গেলে শর্ত অনুযায়ী নিজের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই তাঁকে চলে যেতে হয়। এভাবেই কৌশলে রাজপুত্রের প্রাণ বেঁচে যায়। পরদিন ছিল কার্তিক মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তাই সেই আনন্দে দিনটিকে ধনতেরস হিসাবে পালন শুরু হয়।

    আরেকটি মতে ধনতেরসের কাহিনী হল-ধন্বন্তরী ছিলেন একজন হিন্দু আয়ুর্বেদজ্ঞ ঋষি। তাঁর প্রভাব ও প্রচারেই আমাদের দেশে আয়ুর্বেদ এত প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তাই আয়ুর্বেদ ও মহৌষধের কথা উঠলেই স্মরণ করা হয় ধন্বন্তরীর নাম। তিনি কার্তিক মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিনে  জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাই তখন থেকেই আয়ুর্বেদ সাধকরা তাঁর জন্ম তিথি ধন্বন্তরী ত্রয়োদশী হিসাবে পালন করে। হিন্দিতে এটাকে ধন্বন্তরী তেরস বা সংক্ষেপে ধনতেরস বলে। এর সাথে ধন বা অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই।

    আবার ধন্বন্তরী জন্মেছিলেন ত্রয়োদশী তিথির শেষ লগ্নে। চতুর্দশীর শুরুতে। অর্থাৎ সন্ধিক্ষণে তাই ধন্বন্তরীর মতো আয়ুর্বেদাচার্য কে মর্যাদা দিয়ে চতুর্দশী তিথিতে বিশেষ চোদ্দটি পুষ্টি গুণযুক্ত শাক খেয়ে মানুষ শরীরে এই শীতের শুরুতেই প্রাকৃতিক ভিটামিন বা খাদ্যগুণ প্রবেশ করিয়ে নেন। তাইতো বাঙালীরা এদিন চোদ্দ রকমের শাক অন্নের সাথে গ্রহন করে। ধনতেরসের পরের দিন নরক চতুর্দশী বা ভূত চতুর্দশী। দীপাবলীর আগের দিন এটি। একে ছোটি দিওয়ালিও বলা হয়ে থাকে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে চোদ্দটি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে চোদ্দপুরুষের উদ্দেশ্যে খোলা আকাশের নীচে রেখে তাঁদের উৎসর্গ করা হয়। পূর্বপুরুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভক্তির নিবেদন হিসাবে এই সংস্কারটি বহুদিন ধরে চলে আসছে।

    ভারতে ধনতেরস উৎসব উদযাপিত হয় সোনা, রুপো বা বাসন কিনে। একে সৌভাগ্যের লক্ষণ বলা হয়। নতুন জামাকাপড়ও এ সময় কেনে মানুষ। এরপর করা হয় লক্ষ্মী গণেশেরও পুজো। চারিদিকে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। স্কুপিপোস্ট পরিবারের পক্ষ থেকে সকল পাঠকদের শুভ ধনতেরস ও দীপাবলীর প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই।