বুধবার, মে 12, 2021

দু’দিনেই হিল্লি-দিল্লি

দু’দিনেই হিল্লি-দিল্লি

  • scoopypost.com - Feb 20, 2020
  • সুব্রত গোস্বামী

    একটা সময় "হিল্লি দিল্লি করে বেড়াচ্ছিস" কথাটা শুনলে লোকের মন হত কত না কী! তবে এ যুগে একদিনেই সত্যি সত্যি হিল্লি দিল্লি করে ফেলা যায়।

    একটু রেস্ত খসালেই শনিবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোমবার একটু বেশি রাতে হলেও বাড়ির টেবিলে বসেই ডিনার করবেন। ঝুড়ি চাপা খাবার তো কী হয়েছে? ফাঁকতালে পৃথিবীর যে দু-চারপিস অমর সৃষ্টি ভিজিট করে ফেলেছেন তার জন্য সারাজীবন কলার তুলতে পারবেন মশাই। সে আপনি যাই বলুন, দুনিয়ার সাত আজুবের একখানা দেখে ফেলা সবার কপালে নসীব হয়না। বসের ফোনে সোমবার সকালে আপনার করা "ফিলিং ইল, উইল নট বি এবল টু কাম অ্যাট অফিস" এসএমএসটা কিন্তু দুদিন পরই ডিলিট হয়ে যাবে। রয়ে যাবে আপনার বিষ্ময়-দৃষ্টিতে তাজমলের দিকে তাকিয়ে থাকার মুহূর্তটা, ঘুরে আসার অনেক কাল পরেও বুকের ভেতর স্মৃতির গন্ধে ম ম করা আকবর-যোধাবাঈয়ের প্রেমের ইতিহাস। আগরার লালকেল্লায় দাঁডিয়ে বন্দি শাহ্‌জাহানের চোখ দিয়ে দূরের যে তাজমহল আপনি দেখে ফেলেছেন তা আপনাকে ওই বসের ফোনে পৌঁছনো ছোট্টো মিথ্যেটাকে মুছে দেওয়ার জন্য বারবার পীড়াপিড়ি করবে। মোবাইলটা বের করে ছবিগুলো দেখাতে দেখাতে একদিন বলেই বসবেন, "ঘুরে আসুন স্যর, জাস্ট একদিনের মিছিমিছি লুজ মোশানের বিনিময়ে আপনি কী পেতে পারেন ভাবতে পারবেন না।"

     প্ল্যানটা তাহলে শুরু থেকেই শুরু করি। শুক্রবার রাতটায় ঘুম আপনার কতটা হবে জানিনা। ভোর সাড়ে পাঁচটায় ফ্লাইট হলে আমার মত বাগুইআটিতে থাকা লোকজনেরা ওলা-উবেরের 'রাইড লেটার' অপশনে সওয়া-চারটেতে টাইম সেট করে। আপনি বেহালায় থাকলে সে দায়িত্ত্ব পুরোপুরি আপনার। ও ভালোকথা এই ট্যুরটা মার্চ থেকে জুলাইএর মধ্যে এড়িয়ে চলুন। বুঝতে পারছি গরমে উটকো ছুটি পেতে ডাইরিয়ার অজুহাতটা ভালো, কিন্তু শীতে না হলে স্থাপত্যের প্রেমটা ঠিক উপভোগ করতে পারবেন না। আর চিন্তার কিছু নেই, কোল্ড-অ্যাণ্ড-ফ্লুতেও ছুটি মেলে। মার্চ-এপ্রিলের দিল্লি-আগরা যে কী চিজ যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন। কিচ্ছু এনজয় করতে দেবেনা আপনাকে। যাক প্ল্যানে ফিরি। টিকিট তো আপনি মাসখানেক আগে অফিসের নেট খরচা করেই কেটেছেন, শুধু পাশের কিউবিকালের সুন্দরীটি ছাড়া কেউ জানেন না ব্যাপারটা। তাও ক্যাণ্টিনে কফি খেতে খেতে মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছিল তাই। সাতহাজার সামথিং-এ রাউণ্ডট্রিপ টিকিট পেয়ে গেছেন মানে বউ বা বান্ধবী মিলিয়ে পনেরো সামথিং-এ যাতায়াত উতরে নিলেন। রাজধানী, দুরন্ত'র সঙ্গে তুলনা টেনে সময়টাকে যদি ধরেন আপনি প্রফিটে আছেন কিন্তু। যাক সাতটায় দিল্লি পৌঁছে আগে কিছু খেয়ে নিন। উড়ানকালে সিটে বসে সাড়ে-তিনশোর চিকেন জংলি স্যাণ্ডউইচ-এর দামটা দুই দিয়ে গুন করেই আপনার ক্ষিদে পেট থেকে কপালে উঠে গেছে। "এই তো কাল রাতেই চারপিস পরোটা সাঁটালুম" দিয়ে নিজেকে আটকেরেখেছেন। এক কাজ করুন বরং, জলখাবারটা দিল্লিতে নেমে এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে বেরিয়েই করুন। প্রিপেড ট্যাক্সিতে উঠলে খামোখা অনেক টাকা লেগে যাবে। এমনিতেই কোন এক সবজান্তা যেন আপনাকে বলেছে আরেকটু আগে কাটলে প্লেনের টিকিটটা কিছু কম হলেও হতে পারত। তারপর থেকে আপনার মাথাটা একটু গরমই আছে। যাই হোক মেট্রো ধরুন মেট্রো। দিল্লির মেট্রোও কিন্তু দেখার মত একটা জিনিস। ঝকঝকে তকতকে! ভোরবেলা থেকেই শুরু হয়ে যায়। এয়ারপোর্ট থেকে উঠুন আরকিছুক্ষণের মধ্যেই চাঁদনি চকে নামুন। কাউকে জিজ্ঞাসাটিজ্ঞাসা করে একটু পরাঠেঁ-ওয়ালি গাল্লিতে ঢুঁ মেরে আসুন। দিল্লিতে অনেক টোটো চলে। টোটোয় উঠে বলুন নিয়ে যাবে। ঘিয়েভাজা পরোটার গন্ধে প্রথমে লোভ সামলাতে না পেরে গোটা চারেক সাঁটানোর পর আপনার হয়তো মনে পড়বে, “আরে, কাল রাতেও তো পরোটাই খেয়েছিলাম!’’ এখানকারটা কেমন খেলেন সেটা নিজের মনের মধ্যে রেখে দিয়ে কাল রাতে বউয়ের হাতে বানানো পরোটার একপ্রস্থ সুনাম সেরে টোটোয় ওঠার আগে ডিসিশান নিন এখন ঠিক কী করতে চান। আমি যদ্দূর জানি আপনাদের দুজনের কাছে এমন কোনও লটবহর নেই যে সেটা নিয়ে বেড়াতে আপনাদের হ্যাপা হতে পারে। কার কাছে যেন শুনেছিলাম, এমন মেয়েই বিয়ে করা উচিত যে সাতদিনের ট্যুরের মালপত্তর একটা ন্যাপস্যাকে সালটে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এটা তো দু’দিনের দিল্লি। ছাড়ুন, কথা না বাড়িয়ে চাঁদনি চকের আশেপাশে একটা হোটেল দেখে চেক-ইন করেই নিন। বোঝা যাচ্ছে, চারটে পরোটার পর একগ্লাস চা খেয়েই আপনার ডাক এসেছে।

     আশা করছি, হোটেল থেকে সবকিছু সেরে বেরোতে বেরোতে এগারোটার কাছাকাছিই বাজবে। এতক্ষণে আপনি খেয়ালই করেননি যে আপনার ফোনের জিপিএস বলে দিচ্ছে, পৃথিবীর দু’খানা অবিস্মরনীয় সৃষ্টির খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন আপনারা। লালকেল্লা আর জামা মসজিদ। বারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত জামা মসজিদে ঢুকতে দেয় না। তাই সময় থাকতে থাকতে আগে মসজিদটা দেখে নিন। ইসলামিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন এই জামা মসজিদ। আপনি যাই বলুন মসজিদ জিনিসটা দেখতে অসাধারণ। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর একেকখানা মসজিদ। আমার কথা বিশ্বাস না’হলে গুগল করে দেখতে পারেন।

    জামা মসজিদ ভিজিট সেরে এবার রেডফোর্ট চলে আসুন। ক্ষিদে-টিদে পায়নি তো? ঠিক আছে এটা দেখেই না হয় খাবেন। দিল্লিতে যে’কটা দেখার জায়গা রয়েছে তার প্রায় সবটাতেই মেট্রো করে পৌঁছনো যায়। আপনাদের গাড়ি নেওয়ার কথা বলিনি কারণ শনি-রবি পার্কিং কোথায় পাবেন না পাবেন, আবার সেখান থেকে হেঁটে আসবেন, তার থেকে বরং মেট্রো থেকেই হাঁটুন বা টোটো নিয়ে নিন। আর এখন আমার এই জ্ঞানবানী মনে না রেখে ওখানে পৌঁছে গেলেই দেখবেন বুদ্ধি বের করে নিতে পারছেন।

    লালকেল্লার ভেতরে ঢুকে কিন্তু অনেকটা হাঁটতে হবে। হিসেবি মানুষদের বেশি ভুল হয় তাই বলে দিই, দু’বোতল ব্র্যান্ডেড জল বাইরের দোকান থেকে কিনুন। লালকেল্লার সামনে তেষ্টায় গলা ফাটছে আর আপনি হিসেবি মানুষ তাই একই দাম দিয়ে নকল জল আত্মা ধরে কিনতেও পারছেন না, ব্যাপারটা কিন্তু আমার খারাপই লাগবে।

    লালকেল্লা। আজ যেহেতু শনিবার, ভিড় আপনাকে একটু বেশিই সহ্য করতে হবে। শাহ্‌জাহানের তৈরি সেই অমর সৃষ্টিটা তো কাল দেখবেন।তার আগে এটাও দেখে নিন। তাঁর আমলেই তৈরি। ঢুকে দেখবেন কেল্লার ভেতরেই কেনাকাটার পসরা। এমন একটা হেরিটেজের মধ্যে এসব দেখে একটু অবাক লাগতেই পারে আপনার। মেনে নিন। এটা যেহেতু একদমই ঝটিকা সফর বেশি ডিটেলে গেলে চলবেনা আপনার। তা নাহলে দিল্লি আগরার একেকটা স্থাপত্য খুঁটিয়ে দেখতে একটা গোটা দিনও কম পড়ে যায়। আপনার কিছু করার নেই কারণ আপনার অফিস আছে এবং অফিসে একপিস ‘খড়ুস’ বস আছেন। একটি মাত্র দিনে দিল্লির যেগুলো সব থেকে ভালো লাগার সেগুলোই দেখে নিন। কী আর করবেন?

    চাঁদনিচক থেকে আবার মেট্রোতে উঠুন। এবার আপনারা কুতুব মিনার দেখতে যাবেন। একটা কথা শুনে নিন, দিল্লিতে প্রতিবার মেট্রোয় ওঠার আগে জিজ্ঞাসা করে নেবেন যেখানে যেতে চান সেখানে কোন মেট্রো যাবে। কোথায় নেমে মেট্রো বদল করতে হবে। আরে আপনি তো আর এ’পাড়ার ছেলে নন মশাই। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না তাই কুতুব মিনার যাবার পথে ট্রেন বদলাতে হয়েছিল কিনা বলতে পারছি না। ১০ মিনিটের ব্যবধানে ট্রেন। একঘণ্টায়  কুতুবমিনার পৌঁছে যাবেন। লাঞ্চ আপনারা চাঁদনি চকেই সেরে নিয়েছেন। খুব বেশি হলে সাড়ে তিনটে বাজে।নিন এবার দু’জনের কাঁধের দুটো ঝোলা জমা করে কুতুবমিনার দর্শনে লেগে পড়ুন। কার কী মত জানি না, কুতুবমিনার দিল্লিতে আমার দেখা সেরা স্থাপত্য। এমনিতেই হাতে সময় নেই। তাও বলি এখানে কিছুটা সময় কাটান। মিনারের মাথায় হাত রেখে ছবি তোলায় না মেতে পারলে বোর্ডের লেখাগুলোয় একটু চোখ বোলান। ভালো লাগবে। খসখসে পাথরের ওপর খোদাই করা কারুকাজ, অবাক হয়ে দেখুন। স্থাপত্যের এটাও একটা বিশেষ বিভাগ। আপনার চোখের সামনে আড়াই’শ ফুটের লম্বা যে মিনারখানা ঢ্যাংঢ্যাং করে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা কিন্তু এ’রকম খসখসে এবড়োখেবড়ো পাথরের মিনারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। হ্যাঁ, পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে উঁচু।

    বিকেল হয়ে গেছে। যদিও এদিকটায় একটু দেরি করে সূর্য্য ডোবে। নিন আবার মেট্রো ধরুন। খুব ছোটাচ্ছি, তাই না? আচ্ছা একটু চা খেয়ে তারপরই না হয় মেট্রোয় উঠবেন। সাত’শ বছর আগের একটা স্থাপত্য দেখার পরেই এবার আপনি যা দেখবেন তার বয়স পনেরোও হয়নি। আচ্ছা ট্রেনে উঠুন বলছি। এবার কিন্তু ট্রেন বদল করার ব্যাপার আছে। কোথায় নেমে বদলাবেন সেটা স্টেশনে পৌঁছে জেনে নেবেন। আমার এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। সেণ্ট্রাল রোড না কী একটা যেন। যাকগে, এতেও ঘণ্টা খানেক লাগবে। যমুনা ব্যাঙ্ক নামটা মনে আছে, ওর পরের স্টেশনটাতেই নামতে হবে। অক্ষরধাম। মেট্রো স্টেশনের কাছেই মন্দির, তবে অটোও পাওয়া যায়।ওয়ান ওয়ে তাই ঘুরে যেতে হয়। যাই হোক যেটা দেখতে চলেছেন তা কিন্তু সৃষ্টি হিসেবে অসাধারণ। সে আপনার ঈশ্বর বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক। “আমি মন্দির-টোন্দিরে ঢুকি না” এরকম গোঁড়ামি নিয়ে থাকলে মিস করবেন। সাধারণত মন্দির আমরা নোংরা দেখতেই অভ্যস্ত। এটা কিন্তু একদম উলটো। ঝকঝক করছে। আলো থাকতে থাকতে যতটা পারেন দেখে নিন। আলো নিভলে চমক অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। লাইট-অ্যাণ্ড-সাউন্ড শো। জনপ্রতি একশো’র মধ্যেই দাম টিকিটের। প্রথম শো সূর্য্য ডুবলেই শুরু করে। কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের শো, মন ভরে যাবে। এখানেও কিন্তু আপনার বোঁচকাবুঁচকি সব বাইরে রেখে যেতে হবে।

    যাক মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে ওই কম্পাউন্ডের মধ্যেই ভালো খাবারের দোকান পাবেন। নিরামিষ স্ন্যাক্স, সফটড্রিঙ্ক, বার্গার, কফি, ইত্যাদি পাবেন। ভালোই। আজ ভোরেই নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ি থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের তিন পিস ইসলামিক স্থাপত্য আর একখানি বেলেপাথর, মার্বেলের তৈরি অপূর্ব সৃষ্টি ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছেন।বার্গারে কামড় বসাতে বসাতে এটা ভেবেই একটুশিহরিত হয়ে নিন বরং। পারলে কম খান, এখনও অনেককিছু খাওয়া বাকি আছে। দিল্লি এসেছেন পাহাড়গঞ্জের মার্কেটে ঘুরবেন না, তা হয় নাকি? চলুন এবার হেঁটেই আসুন মেট্রো স্টেশনে।এখান থেকে টুক করে আরকে আশ্রম মেট্রো স্টেশনে নামুন। এই নামটা মনে আছে কেন বলুন তো? রামকৃষ্ণ নামের কোনও কিছু দেখবেন আর বাঙালি হয়েও সেটা ভুলে যাবেন তা হয় না।আরকে আশ্রমে নেমে একটু হেঁটে পাহাড়গঞ্জ বাজারে চলে আসুন। এখানে কী পাওয়া যায় না সেটাই বলুন। গলৌটি কাবাব থেকে শুরু করে গামবুট গড়গড়া হয়ে গো-বিরিয়ানি, সব। চাইলে সস্তায় কাবাব, চিকেন তন্দুরি প্যাঁদাতে পারেন।ঝটিকা সফরের শপিং চাইলে এখানে সেরে নিন। বাজারের রাস্তা ধরে সাজানো পসরা দেখতে দেখতে নতুনদিল্লি স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারেন। হ্যাঁ, পাশেই।চাঁদনিচকের সেই হোটেলটায় সকালে বেগের ঠেলায় চেক-ইন না করে থাকলে এখানে সস্তায় থাকতে পারতেন। না ছাড়ুন ওটা এগুলোর থেকে ভালো। এবার অটো ধরুন। মেট্রোও যায় তবে মাঝে চেঞ্জ করতে হবে, তাই অটো বা ট্যাক্সিতেই দুজনায় এগিয়ে যান হোটেলের দিকে। আধঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন। কাল ভোর বেলা ট্রেন। আপনারা আগরা যাচ্ছেন।