বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 22, 2020

বাস্কেটবল, কাস্ত্রো ও ফুটবলের রাজপুত্র

বাস্কেটবল, কাস্ত্রো ও ফুটবলের রাজপুত্র

  • scoopypost.com - Oct 02, 2019
  • রাজু মুখোপাধ্যায়

    একটা সময় ছিল যখন দিয়েগো মারাদোনার খুব খারাপ অবস্থা চলছিল। স্পনসররা হাত গুটিয়ে নিয়েছে, তথাকথিত বন্ধু-শুভচিন্তক-স্তাবকের দলও উধাও। কেউ নেই পাশে। বিশ্ব-ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ প্রতিভাবান ফরওয়ার্ড ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিলেন অবসাদে। পায়ের জাদু দেখিয়ে বিশ্ব মাত করে দেওয়া ফুটবলের রাজপুত্র শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে ক্রমেই শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন। সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল ড্রাগ, মদের নেশা।

    মাঠে তাঁর ‘হাত’ আর পায়ের জাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত প্রতিপক্ষ। বল যেন কথা বলত বুটের সঙ্গে। যে ভাবে বল সামলাতেন অবলীলায়, সেভাবে নিজেকে অবশ্য সামলাতে পারেননি। আর্থিক টানাপোড়েনে জর্জরিত মারাদোনা প্রতিদিন নিজেকে যেন আরও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন। প্রতিদিনই তাঁর এমন কীর্তি-কাহিনি ঠাঁই পেত সংবাদপত্রে। কারুর কাছে যাওয়ার নেই, কোনও দেশ থেকেই নেই আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ। কোনও মনোবিদ ছিল না, ছিল না কোনও কাউন্সিলর। এগিয়ে এসে আর্থিক সাহায্য করার মতো সহৃদয় কারুর টিকিও দেখা যেত না।

    এরকম দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে মারাদোনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন একজনই। তিনি কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো। এই ইনসেনসিটিভ অটোক্র্যাটই মারাদোনাকে সেদিন আশ্রয় দিয়েছিলেন। রাজধানী হাভানাতেই শুরু হয়েছিল মারাদোনার রিহ্যাব। প্রায় মরতে বসা বিশ্বের অন্যতম ফুটবল বিস্ময়কে সেদিন বাঁচতে সাহায্য করেছিলেন কাস্ত্রো।

    প্রতিদানে কিচ্ছুটি চাননি কাস্ত্রো। এমনকি কিউবার জাতীয় দলের কোচ হওয়ার জন্যে একবারের জন্য অনুরোধও করেননি মারাদোনাকে। কিউবাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে ব্যবহার করেননি মারাদোনার জনপ্রিয়তাকেও। ২০১৬-য় ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর কাঁদতে কাঁদতে মারাদোনা বলেছিলেন, “আমার দ্বিতীয় বাবাও চলে গেলেন, এবার কার কাছে যাব?” বোঝা যায় মারাদোনার মনের কতখানি জায়গা জুড়ে ছিলেন কাস্ত্রো।

    মনেপ্রাণে ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক। প্রাচীন গ্রিকদের মত তিনিও বুঝেছিলেন অধুনা বিশ্বে খেলাধুলোর প্রসার কতটা প্রয়োজনীয়। খেলাধুলার প্রচার, তার শৈল্পিক দিক, সামাজিক মূল্য আর সুবিধা বুঝেছিলেন তিনি। সমসাময়িক সব রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ফিদেল কাস্ত্রোই তাই মূর্তিমান ব্যতিক্রম। মুক্ত চেতনার অধিকারী হয়ে তিনি বুঝেছিলেন একমাত্র খেলার ময়দানেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ সব মিলেমিশে এক হয়ে যেতে পারে।

    ফিদেলের নির্দেশেই কিউবায় সমস্ত স্কুল পড়ুয়াদের জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল খেলাধুলা। কাস্ত্রোর জমানায়, সে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল শতকরা পঁচানব্বই শতাংশ। বয়স্কদের ইনডোর গেমসে বিশেষ করে দাবা খেলায় উৎসাহিত করতেন তিনি। হেলথ ওয়াক বা স্বাস্থ্যের জন্য হাঁটা, এখন যা খুব জনপ্রিয়। আসলে তা কাস্ত্রোরই ভাবনার ফসল।    

    কাস্ত্রো খেলাধুলাকে দেশপ্রেমের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তিনবারের অলিম্পিক গোল্ড মেডালিস্ট কিউবান বক্সার ফেলিক্স স্যাভন ফ্যাবার তার জ্বলন্ত উদাহরণ। বক্সিং রিংয়ে বিশ্বের অন্যতম নাম ফেলিক্স আজীবন থেকে গেছেন ছোট্ট ক্যারিবিয়ান দ্বীপটিতেই। ট্রেনিংও নিয়েছেন কিউবান কোচের থেকে। ব্যবহার করেছেন দেশীয় পরিকাঠামোই। তবুও ১৯৯২, ১৯৯৬ আর ২০০০ সালে পরপর তিনবার ছিনিয়ে নিয়েছেন বক্সিং অলিম্পিকের সোনা। হেভিওয়েট বক্সিংয়ে প্রবাদপ্রতিম এই চরিত্র প্রতিপক্ষকে নক আউট করে বলতেন, “আমি নই, কিউবা জিতেছে।” শুধু ফেলিক্স স্যাভন-ই নন, কাস্ত্রোর জমানায় এমন বহু কিউবান খেলোয়াড় শুধু দেশকে ভালবেসেই গড়েছেন ইতিহাস।

    তবে, কাস্ত্রো কোনওদিনই ক্রীড়ামোদী হিসাবে বহির্বিশ্বে স্বীকৃতি পাননি। তার কারণও তিনি নিজেই। লক্ষ্যে তিনি আপসহীন আর তাই পৃথিবীর সুপারপাওয়ার বা মহাশক্তিধর দেশগুলির কাছে মাথা নত করেননি কোনও দিন। সুপুরুষ অথচ অসামান্য এক ব্যক্তিত্ব প্রায়শই বলতেন, “আমি একার রাজত্বেই থাকতে ভালবাসি।”

    পশ্চিমের দেশগুলি থেকে কোনও সাহায্য নেওয়া পছন্দ করতেন না কাস্ত্রো। রাজনীতিবিদ থেকে তথাকথিত বিদ্বজ্জন, যাঁরা পশ্চিম-বিরোধী স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করতে ভালবাসতেন, তাঁরাই বিন্দুমাত্র সুযোগ পেলেই পশ্চিমে দৌড়তেন। সেখানকার সমস্ত সুযোগসুবিধে নিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ হত না তাঁদের। কাস্ত্রো সেখানে মূর্তিমান ব্যতিক্রম। আপসহীন আর সুবিধাবাদের উলটো রাস্তায় হাঁটা এক মানুষ।

    ১৯৭৭ সাল। স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বা ‘সোয়াস’ –এর লন্ডন হাউসে বন্ধুবর উদয়ন মুখোপাধ্যায় ও আমার সঙ্গে এক কিউবান যুবকের আড্ডা জমে উঠেছে। কিউবার বিপ্লবের সময় দেশ ছেড়ে ভাগ্যান্বেষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি দিয়েছিল সে। কষ্ট করে হলেও পড়াশোনা চালিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে শেষমেষ থিতু হয়েছে ইংলন্ডে। কিউবার বিপ্লব সম্পর্কে কথা হচ্ছিল আমাদের। সেই যুবকের কথায় বারবার উঠে আসছিল বিপ্লবে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটিতে খেলাধুলার প্রভাবের কথা। সে বলছিল, তারা বক্সিংয়ে বিশ্বসেরা, বেসবল আর বাস্কেটবলেও একনম্বর। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আর রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করা এমন একজনের মুখে খেলাধুলা নিয়ে এত কথা সত্যি আমাদের অবাক করেছিল।

    এর প্রায় চল্লিশ বছর পর, সেই সঙ্গীর নামটাই এখন মনে পড়ে না। তবু, মনে আছে, সে বলেছিল, তেওফিলো স্টিভেনসন ছিল তার পড়শি। এই কথাটা মনে পড়লেই লন্ডন হাউসের সেই কিউবান যুবকের মুখটা চোখে ভাসে।

    তেওফিলো স্টিভেনসনের নাম জানেন, এমন মানুষ কমই আছেন। তেওফিলো ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালের অলিম্পিকে অবিসংবাদী হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। পরে ১৯৮০ সালেও তাঁর গলায় আবার ঝুলেছিল সোনার মেডেল। তেওফিলোর মতো বক্সার সত্যিই ফরগটেন লেজেন্ড। শুধু কি লো প্রোফাইল দেশ কিউবায় জন্মগ্রহণ করাই তাঁর দোষ? কে জানে। স্টিভেনসনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন তিনি পেশাদার হয়ে রিংয়ে নামছেন না, যেখানে মহম্মদ আলি বা সমসাময়িক কারুর সঙ্গে বাউটে লক্ষ লক্ষ ডলার উপার্জন করতে পারবেন সহজেই? মৃদু মাথা নেড়ে স্টিভেনসন করেছিলেন বিখ্যাত সেই উক্তি, “লক্ষ কিউবানের ভালবাসার কাছে লক্ষ ডলার কিছুই নয়।” আমৃত্যু দেশ ছাড়েননি স্টিভেনসন। যেমন শুধুমাত্র টাকা আর খ্যাতির জন্য ভারত ছাড়েননি হকির জাদুকর ধ্যানচাঁদ বা কিংবদন্তী পর্বতারোহী তেনজিং নোরগে।

    ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন একদম অন্যমাপের কূটনীতিক। সাংসদ-মন্ত্রী-আমলাদের বার্ষিক রঙিন ক্রিকেট মনোরঞ্জন নয়, সত্যিকারের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষজনের জন্য তাঁর ভালবাসা ছিল নিখাদ। মাও জে দং নাকি বিশাল বিশাল নদী সাঁতরে পার করতেন। বহু দুঁদে ব্রিটিশ রাষ্ট্রনেতা স্কুল আর ইউনিভার্সিটি পর্যায়ে ক্রিকেটও খেলেছেন। কিন্ত কাস্ত্রোই প্রথমে বুঝেছিলেন খেলাধুলার সর্বাঙ্গীন আবেদনের কথা। তাঁর কথায়, দেশ স্বাস্থ্যবান তখনই হবে, যখন দেশে স্বাস্থ্যবান মানুষ থাকবে।

    তৎকালীন পূর্ব জার্মানি, সোভিয়েত রাশিয়া, কমিউনিস্ট চিনের মতো খেলাধুলাকে প্রচারের হাতিয়ার করতে চাননি কাস্ত্রো। তাঁর ভাবনা ছিল একদম আলাদা। উচ্চকোটির খেলা বা এলিট স্পোর্টস নয়, কাস্ত্রো চেয়েছিলেন খেলাধুলায় সব মানুষের যোগদান। তাই শারীরশিক্ষা কিউবার সব প্রাইমারি স্কুলে বাধ্যতামূলক করেছিলেন তিনি। সুস্থ প্রতিযোগিতা চাইলেও তাঁর দর্শন ছিল শারীরশিক্ষায় মানুষকে উৎসাহিত করে সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি দেওয়া। আইনজীবী, বিপ্লবী, রাজনৈতিক এই ব্যক্তিত্ব তাঁর সময়ের থেকেও মানসিকতায় অনেকটাই এগিযেছিলেন।   

    আন্তর্জাতিক স্তরে কিউবার খেলোয়াড় তথা দেশবাসীর মনে এক অদ্ভুত গর্বের সঞ্চার করেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। অ্যাথলেটিকস, বক্সিং, বাস্কেটবল আর বেসবলে আন্তর্জাতিক স্তরে কিউবানদের সাফল্যের স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগও করতেন। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক পড়াশোনার নামী অধ্যাপক রবার্ট হুইসের মতে কিউবার দেশবাসীর মনে খেলাধুলা নিয়ে আজন্ম এক শ্রদ্ধা লালিত হয়। জেভিয়ের সোতোমেয়রের কথাই তার প্রমাণ। 

    জেভিয়ার সোতোমেয়র ছিলেন এক অসামান্য স্পোর্টসম্যান। তিনিই পৃথিবীর একমাত্র হাইজাম্পার যিনি ৮.০৪৬ ফুট লাফিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। কিউবানরা বাড়ির দরজায় সোতোমেয়রের হাইজাম্পের মাপ লিখে রাখতেন। এও এক শ্রদ্ধা বইকি।

    অলিম্পিকে ৪০০ মিটার ও ৮০০ মিটারে সোনাজয়ী কিউবান মিডল ডিসট্যান্স রানার অ্যালবার্তো হুয়ানতোরেনার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষেরই জিভ বেরিয়ে গিয়েছিল। 

    ফিদেল কাস্ত্রোর মতো খেলাধুলার প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা আর কোনও দেশের রাজনৈতিক নেতানেত্রীর মধ্যে খুব কমই দেখা যায়। তাঁর আমলে কিউবার শক্তি ছিল খেলাধুলাকে কেন্দ্র করেই। যা একইসঙ্গে বাড়িয়েছিল কিউবানদের গর্ব আর আত্মসম্মানও। কিন্তু খেলাপাগল এই মানুষটা নিজে কতটা স্পোর্টসম্যান ছিলেন? এ নিয়ে লেখা শেষ হওয়ার নয়। ফিদেল কাস্ত্রো নিজে বেসবলটা অসাধারণ খেলতেন। বেসবল ব্যাট হাতে তাঁর ছবিও দেখা যায়। ছিলেন ভাল পিচার বা বোলারও। তবে নিজের সম্পর্কে কোনও প্রশংসাসূচক কথা বলতে চাননি তিনি। শুধু বলতেন, “কখনও চ্যাম্পিয়ন হতে পারলাম না, খুব ভালো কখনোই খেলতে পারিনি, অনুশীলনের জন্য সময়ই বার করতে পারলাম না।”  নিজেকে নিয়ে কোনও ভণ্ডামি নেই। এমনটাই ছিলেন কাস্ত্রো।

    ছ’ ফুট তিন ইঞ্চির দীর্ঘদেহী ফিদেল কাস্ত্রোর সবচেয়ে পছন্দের স্পোর্টস ছিল বাস্কেটবল। চওড়া কাঁধ আর লম্বা চেহারার দৌলতে তাঁর ছিল প্রচুর শক্তি। গোটা কোর্টে অনায়াস বিচরণ আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে মাপা পাসে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত প্রতিপক্ষ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত খেলার প্রতি তাঁর প্রেমের কথাই বলে গেছেন। কোনও হাতিয়ার নয়, তাঁর কাছে ক্ষমতার উৎস ছিল খেলা। ওয়ার উইদাউট ওয়েপনস। 

    কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো কোনওদিন তাঁর কাজের স্বীকৃতি পাননি। বরং বিশ্বের বহু দেশের সংবাদমাধ্যমে তাঁর ইমেজকে নেতিবাচকই দেখানো হয়েছিল। তবে খেলার ইতিহাসে সসম্মানে জায়গা করে নেবেন কাস্ত্রো। তাঁর নিজের গুণেই। তাঁর উৎসাহে, ভালবাসায় বিশ্বক্রীড়ায় কিউবানদের গড়া প্রত্যেকটি অসাধারণ রেকর্ডও খোদাই হয়ে থাকবে চিরকালের জন্য।   

    শুধু মুখের কথায় যে কাজ হয় না, তা বুঝতে পেরেছিলেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এই রাষ্ট্রনেতা। তাই, সাধারণ মানুষের মধ্যে খেলাধুলার উৎসাহ বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছিলেন তিনি। তিনি বুঝেছিলেন, খুব কম সময়ের মধ্যে একটি দেশ ক্রীড়াজগতে নৈপুন্য দেখিয়েই গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে। সত্যিকারের সমাজতান্ত্রিক চেতনায় রাঙানো ছিল কাস্ত্রোর মন। পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত, উপেক্ষিতদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন তিনি। শিক্ষার সঙ্গে খেলার মেলবন্ধনে তিনিই দিশারি। চিরকালীন হোক তাঁর স্মৃতি।