বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 29, 2020

অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস: সমস্যা ঠিক কোথায়?

অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস: সমস্যা ঠিক কোথায়?

  • scoopypost.com - Oct 02, 2019
  • অহনা চট্টোপাধ্যায়

    অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের কথা শুনলেই হরেক ছবি মাথায় ভিড় করে। স্কুবা ডাইভিং, ট্রেকিং, মাউন্টেনিয়ারিং, বাঞ্জি জাম্পিং, ক্যানোয়িং, কায়াকিং, প্যারাগ্লাইডিং, স্কিইং, মাউন্টেন বাইকিং এমন কত কী। কিন্তু আমাদের এ দেশে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের সুযোগ-সুবিধে কি আদৌ আছে? অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসেপেশাদার ক’জনের নাম জানি আমরা?

    অর্চনা সারদানার নাম শুনেছেন? একটু অবাক হলেন না? যদি বলি ইনিও একজন খেলোয়াড়, ভুরু কুঁচকে যাবে অনেকেরই। ক্রিকেট ঈশ্বরকে পুজো করা পরিসংখ্যান বিদরাও হাতড়ে ফেলবেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের ইতিহাস। মিতালি, ঝুলন, হরমনপ্রীত কউরের সঙ্গে অর্চনা সারদানা নামটাও তো তেমন চেনা ঠেকছে না। ব্যাডমিন্টনে, স্কোয়াশে, তিরন্দাজিতে, রাইফেল শুটিংয়ে, টেবল টেনিসে মায় বক্সিংয়েও এই নামটার কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন কে এই অর্চনা সারদানা।

    বয়স চল্লিশ, পেশায় ইন্টিরিয়র ডিজাইনার, নিজের সংসার সামলে অর্চনাই দেশের একমাত্র ও প্রথম বেস (বিল্ডিং-এরিয়াল-স্প্যানআর্থ) জাম্পার। শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়, ভয়ডরহীন অর্চনা ১২,০০০ ফুট উঁচু সেতু থেকেও ঝাঁপ দিয়েছেন। আবার আন্দামানে সমুদ্রের প্রায় ৯৯ ফুট গভীরে স্কুবা ডাইভিং করে সমুদ্রতলে ভারতের জাতীয় পতাকা মেলে ধরেও নজির গড়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে এমন অর্চনার বড় অভাব। মাউন্টেনিয়ারিং বা পাহাড়ে চড়া নিয়ে যদিও বা বাচেন্দ্রী পাল,ছন্দা গায়েনের মত ক’জনের নাম বলতে পারি, অন্য অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসেও উল্লেখ করার মতো স্ত্রী-পুরুষ কোনও নামই নেই।

    আমাদের দেশে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে পেশাদারিত্বের চল প্রায় নেই বললেই চলে। ক’জন আর অর্চনার মতো ভয়ডরহীন জীবনকে বেছে নেওয়ার মত সাহস দেখাতে পারেন? তামিলনাড়ুতে প্রতি বছর পোঙ্গল উৎসবে জাল্লিকাট্টুর আসর বসত। খ্যাপা ষাঁড়কে বশে আনার এই খেলায় অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ হত ভালোই। ওই দক্ষিণেই রেকলারেস বা বলদগাড়ি ছোটানোর মতো প্রতিযোগিতাতেও বহু মানুষ ভিড় করতেন। দেশের শীর্ষ আদালতের রায়ে এই দুই একান্ত ভারতীয় অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস আপাতত বন্ধ। বিশ্বমানের সেলিব্রিটি শুটার রাজ্যবর্ধন রাঠোর কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ আলো করেছেন। তাঁর আমলেই স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার নাম বদলে হচ্ছে স্পোর্টস ইন্ডিয়া। আমরা এ দেশে তথা এ রাজ্যেই অনূর্ধ্ব সতেরো বিশ্বকাপের আয়োজন করেছি। ছোট থেকেই দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের তুলে আনার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যে দেশে পাহাড়-জঙ্গল-নদী-সমুদ্র-হিমবাহের ছড়াছড়ি,যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম তথা স্পোর্টসের টানে প্রতিবছর হাজারো মানুষ আসেন। ভিড় জমান হিমালয়ের বিভিন্ন শৈলশহরে। প্যারাগ্লাইডিং, সেলিং বা স্কিইংয়ের মত দুঃসাহসিক অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে অংশও নেন। দু’একটি রাজ্য সরকারের সীমিত উদ্যোগ বা বেসরকারি কিছু সংস্থার সৌজন্যে শীতকালীন ক্রীড়ার আসর বসে।

    আমাদের দেশে স্কিইংয়ের অন্যতম নাম মানালির অঞ্চল ঠাকুর, যিনি তুরস্কে স্কিইংয়ের বিশ্বখ্যাত আসর আ্যালপাইন এজডের কাপ প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ জিতে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন, তাঁর নামও তেমন শোনা যায় না। অঞ্চলের বাবা তথা উইন্টার গেমস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার সেক্রেটারি জেনারেল রোশন ঠাকুরের গলাতেও ধরা পড়ে হতাশা।

    অথবা শীতকালীন অলিম্পিকসে একশো কুড়ি কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা একমাত্র প্রতিযোগী শিব কেশবন যখন জানান তাঁর নিজের দেশেই পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। আমাদেরলজ্জা হয় না। সাউথ কোরিয়ার পেইয়ংচ্যাংয়েই শীতকালীন অলিম্পিকসে প্রথমবার অংশ নেওয়া জগদীশ সিংযের কাহিনি আরও করুণ। ইভেন্টের ঠিক দুদিন আগে ক্রস কান্ট্রি স্কিইং সেন্টারে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন ভারতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তাঁর প্রতিযোগিতার উপযুক্ত সরঞ্জাম এমনকি রেসিং স্যুটটাও এসে পৌঁছয়নি। এ দুঃখগুলো দেশের খেলার জগতে কালো দাগের মতো রয়েই যাবে।

    আর একটা অন্য গল্পও বলি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চোদ্দো হাজার তিনশো ফুট উপরে লাদাখের দুর্গম এলাকা চাংথ্যাংয়ে চিবরা কারগাম নামে একটা গ্রাম আছে। সম্প্রতি এই জায়গাটির কপালে জুটেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ আইস-রিঙ্ক শিরোপা।এখানেই আইস্কেট নামে একটি বেসরকারি সংস্থা, নিউ ইয়র্কের দি হকি ফেডারেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ আইস হকি ইভেন্টের মাঠ। নিউ ইয়র্কের এই সংস্থাই আয়ারল্যান্ড, ইউক্রেন, ইজিপ্ট ও আর্জেন্তিনায় এমন আইস রিঙ্ক তৈরি করেছে। সরকার চুপ। অথচ এখানেই অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের একাধিক ইভেন্টের পরিকাঠামো তৈরি করা যেত অনায়াসেই।

    লাদাখের স্থানীয় তরুণ ও যুব সমাজের অংশগ্রহণ বাড়ত, খুলে যেত রোজগারের পথ। বিশ্বের কাছে অন্য মাত্রা পেত ফুংসুক ওয়াংড়ুর লাদাখ। আমাদের এ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, থুড়ি বাংলাতেও, অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের একাধিক জায়গা আছে। উত্তরবঙ্গে খরস্রোতা তিস্তার জলে ব়্যাফটিংয়ের সুযোগ,বঙ্গোপসাগরের সৈকত মন্দারমণি, তাজপুরে আছে প্যারাগ্লাইডিংয়ের রোমাঞ্চ।

    দার্জিলিং, পুরুলিয়া আর বাঁকুড়ায় আছে মাউন্টেনিয়ারিং বা পর্বতারোহণ শেখার ব্যবস্থা। কিন্তু অভাব আছে উপযুক্ত প্রশিক্ষক, আর সরঞ্জামের। ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকরা। আর কমছে আগ্রহও। যদিও পর্বতারোহণে বসন্ত সিংহরায়, সত্যরূপ সিদ্ধান্ত, দেবাশিস বিশ্বাস এখনন বিশ্বের দরবারে বাংলার মাথা উঁচু করেছেন। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আদৌ কিজনপ্রিয় হয়ে উঠছে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস?

    শূন্য থেকে সাগর, ঝুঁকির ঝাঁপে সেরা হওয়া বা বরফে ঢাকা প্রান্তরে বিপদকে অগ্রাহ্য করে হু হু করে স্কিইংয়ের জন্য কলিজা লাগে, অর্চনা বামানালির মত মহিলারা তা করে দেখিয়ে দিয়েছেন। ভারতে এখনও অ্যাডভেঞ্চারস্পোর্টসের তেমন জনপ্রিয়তা তৈরিই হয়নি। আমরা শুধু টেলিভিশনের ছোট্ট পর্দায় ফেলিক্সবমগার্টনারের সেই বিশ্বখ্যাত স্পেস জাম্প দেখতে ভালোবাসি। ৪৯ বছর বয়সে ভূপৃষ্ঠের ৩৯ কিলোমিটার উপরে উঁচু স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার থেকে বিশ্বরেকর্ডের সেই লাফ। মাটির কাছাকাছি আসতে কোনও বাহন ছাড়াই ফেলিক্সের সর্বোচ্চ গতিবেগ দাঁড়িয়েছিল ১৩৫৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। শব্দের গতিবেগের থেকেও যা বেশি। ভাবা যায়? দরকার নেই বাবা এত ঝুঁকি নিয়ে।

    আমরা বরং দেখি আর শিহরিত হই। মওকা মওকা বলে ভারতের পতাকা নিয়ে উল্লাস তো রইলই।

    (সঙ্গের ছবিটি শিব কেশবনের)