বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 22, 2020

লোকসংস্কৃতির রহস্যে ঘেরা সফর

লোকসংস্কৃতির রহস্যে ঘেরা সফর

ফটো ক্রেডিট : শুভময় পাল

  • scoopypost.com - Dec 26, 2019
  • লোকসংস্কৃতি এক অসীম যাত্রাপথ, সুবিশাল তার পরিধি, অসাধারণ বৈচিত্র্যে ভরপুর, লোকসংস্কৃতির সেই অপার সলিলের গভীরে ডুব দিয়ে মণিমানিক্য তুলে আনলেন স্মৃতিকণা সামন্ত..

    মাঝরাতের রহস্যময় চাঁদ ঝিম ধরায়,নেশাগ্রস্তের মত টেনে নিয়ে যায় এক আদিম জগতে, এই ক্রমাগত পিছনের টানে হেঁটে চলা ক্রমশঃ জড়িয়ে নেয় অনন্ত অন্ধকারে। বিশ্বজুড়ে যেন এক অনন্ত বিশ্বাসের ফাঁদ পাতা।

    টোটেম,ট্যাবু,জাদুর আদিম বুনো জগৎ যেন ধীরে ধীরে মূর্ত হয়ে ওঠে নিখুঁত তুলির টানে। লোকসংস্কৃতি,লোকায়ত ধারার এই যাত্রাপথে গূঢ় গভীর ছাপ ফেলে গেছে এই তিন আদিম বিন্যাস।

    পশুশিকার,পশুপালন ও কৃষিজীবন সভ্যতার এই তিনটি ধাপেই পশুর গুরুত্ব ছিল অসীম। পশুপালনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠল আলাদা আলাদা গোষ্ঠী,টোটেম হল গোষ্ঠী প্রতীক। তৈরি হল মুখোশের ধারণা। মুখোশ হল টোটেমের প্রতিভূ। সে ধারা আজও বহমান। আফ্রিকায় গাছের গুঁড়ি খোদাই করে আদিবাসীরা তৈরি করে মন্ত্রপূতঃ মুখোশ।

     


     


    মিশর,সুদান,জাভা,ইন্দোনেশিয়া,নিউগিনি,পাপুয়া সহ পৃথিবীর সর্বত্রই মুখোশের ব্যবহার হয়েছে। ভারতেও ব্যতিক্রম নয়। দিনাজপুরের মুখাখেলে যে কালী,চন্ডী,নরসিংহ ইত্যাদি মুখোশ ব্যবহার হয় তার ব্যবহার অত্যন্ত বিধিবদ্ধ ও মন্ত্রপুতঃ। মুখোশ পরা ব্যক্তির উপর মুখোশের প্রাণীটির দৈব শক্তির আবেশ ঘটে এই বিশ্বাস। পুরুলিয়ার ছৌনাচে সিংহ,ময়ূরের চালচলন এবং বিশ্বজোড়া নানান নৃত্য ও সঙ্গীতের অনুপ্রেরণা এসেছে এই ধারা থেকেই। গানের সাত সুর সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি বিভিন্ন পশুর ডাকের অনুকরণেই পাওয়া।

    টোটেমের প্রতীক পশুর ক্ষতিতে গোষ্ঠীর বিপদ হতে পারে এই বিশ্বাস থেকে টোটেম ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠে করণীয় ও অকরণীয় বিধি। একই টোটেমভুক্ত মানুষের রক্তপাত নিষিদ্ধ হয়,বন্ধ হয় একই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহ। ফলতঃ শুরু হয় ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহ এবং  আদানপ্রদান হয় রীতিনীতি ও অন্যান্য ব্যবস্থা যা ধীরে ধীরে গড়ে তোলে এক ধারাবাহিক কৃষ্টি ও আচারপ্রণালী,বিবর্তিত হয় সাংস্কৃতিক ধারা। একই সাথে গড়ে ওঠে নানান মূল্যবোধ ও সংযত সুস্থিত জীবনের দিকে এগিয়ে চলে মানুষের সভ্যতা,ধীরে ধীরে রূপ পায় সামাজিক কাঠামো। টোটেম সংক্রান্ত সংস্কারের পাশাপাশি যা সমাজ ও সংস্কারকে বিবর্তিত করল,লোকায়ত জীবনের গভীরে দৃঢ় ছাপ ফেলে গেল, তা হল জাদু।

    জাদু বুঝি সেই প্রাক-ইতিহাসের কাল থেকে মানসিকতার গভীর কোণে বাসা বেঁধেছে। যা কিছু অজানা অলৌকিক তার উপর ভয় জমাট হয়ে বসেছে। ব্যাখ্যার অতীত সমস্ত জাগতিক ঘটনা ও অস্তিত্বকে  জাদু দিয়ে বুঝতে চেয়েছে। তুকতাক,মন্ত্রতন্ত্র,মারণ-উচাটন এবং তার উপকরণ হিসাবে নানান জিনিস যেমন টিকটিকির নখ,মরা ব্যাঙ,ইঁদুরের লোম, এমনি সব হাজারো জিনিস বেদ থেকে ম্যাকবেথ নাটক পর্যন্ত তার অবাধ বিস্তার। এর মানেই হল একই রকমের ধ্যানধারণা শুধু একটি অঞ্চল ভিত্তিক নয়,এর শিকড় ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবী জুড়ে।

    নানান বিপদ ঠেকানোর জন্য বিভিন্ন দ্রব্য সঙ্গে রাখা বা শরীরের সঙ্গে বেঁধে রাখা থেকে আধুনিক তাবিজ কবজ আংটি পাথরে সেই জাদুবিশ্বাস অটুট। কর্ণের কবজকুন্ডল কিংবা বাইবেলের স্যামসনের চুলের গোছা যা তাদের রক্ষাকবচ হিসাবে আঁকা হল তা আসলে প্রতীকী জাদুবিশ্বাস। শিশুর মাথায় কাজলের টিপ,কড়ি, আঙ্গুল কামড়ে দেওয়া এও জাদু বিশ্বাস,বিয়ের কনেকে আনার সময় ভূমিস্পর্শ না করানো আসলে মাটির সাথে মিশে থাকা দেহাবশেষ ভূতপ্রেত যাতে ক্ষতি না করতে পারে এক জাদু বিশ্বাস,এবং পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এধরনের প্রথা দেখা যায়। বিয়ের নিতবর ও নিতকনে কিংবা বেস্টম্যান ও ব্রাইডস মেইড আসলে প্রাচীন জাদু বিশ্বাসের ফসল,অশুভ শক্তির নজর এড়াতেই এই ব্যবস্থা,কোথাও বা বিয়ের আগে বর কনের খড়ের মূর্তি তৈরি করে রাখা হয়।
    হিন্দু বিবাহে যেমন বিয়ের আগে মাটির পাত্র বা সেরকম কিছু ভেঙে ফেলার নিয়ম তেমনি মরক্কো,সুদান,ফ্রান্সে ডিম ভেঙে ফেলা,ইংল্যান্ডে নুন ছড়িয়ে পাত্র ভেঙে দেওয়ার চল আছে। এইসব নিয়ম কিন্তু আদিম জাদুবিশ্বাসের ধারাতেই বহমান। এমনকি বিয়ের বিভিন্ন উপকরণও সারা পৃথিবীতেই প্রায় একই রকম প্রথা মেনে।

    কিভাবে এই সাযুজ্য? কারণ খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় আন্তঃগোষ্ঠী বিবাহ,এক জায়গার প্রথা আসতো অন্য জায়গায়,মিশে যেত সেই ধারার সাথে। তৈরি হত নতুন ধারা। আসলে এই আন্তঃগোষ্ঠী বিবাহ সমাজকে জুড়ে দিল একসুতোয়,আত্মীয়তার সূত্রে কৃষ্টি আচার বিশ্বাস রীতিনীতি বিনিময় হতে লাগল। তৈরি হল বৃহত্তর মানব সমাজ। এই মিলেমিশে যাওয়ার অব্যাহত স্রোতে তৈরি হল মিথ,পুরাণেরও আদি এইসব মিথ আবার ঠাঁই পেল পুরাণে ,সাহিত্যে।
    জলের তলায় সারা পৃথিবী চলে যাওয়ার গল্প হিন্দু পুরাণ ও বাইবেলে সমানমাত্রায় বর্ণিত। আসিরিয়া থেকে পলিনেশিয়া,দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পেরুর পুরাণও নাকি একই ধরণের গল্প রয়েছে। রূপকথাতেও রয়েছে সেই জাদুর প্রতিফলন। সোনার কাঠি রুপোর কাঠি,জলের নীচে প্রাণভোমরা,সিন্ডারেলার জুতো,কুমড়ো থেকে গাড়ি ইত্যাদি তো জাদুকল্পনাই।

    মান্যা থেকে ধর্ম ও জাদু দুটি আপাত নিরপেক্ষ বোধ মিলিতভাবে জন্ম দিল ট্যাবুর,শুরু হল বিভিন্ন বিধি নিষেধ,নির্দিষ্ট নিয়মাবলী,আচারবিধি। পৃথিবীজোড়া এইসমস্ত ধারণা ও বিশ্বাস এক নিরবিচ্ছিন্ন সুতোয় বাঁধা। পলিনেশিয়ায় যা ট্যাবু,বাংলার রাঢ় অঞ্চলে তা খ্যানোত,জুলুতে হলোনিপা,মরক্কোয় বারাকা কিংবা নাগাল্যান্ডের গেন্না আসলে ভিন্ন ভিন্ন নামে আজন্ম লালিত লোকবিশ্বাস,লোকাচার যা হাজার হাজার বছর ধরে জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মনের গোপনে,তার জীবন চর্চায়,আচরণে।
    অদৃশ্য অলৌকিক ও অতিলৌকিককে খুশি করার জন্য বিভিন্ন জাদু উপকরণ,নাচ গান পোশাক বিবর্তিত হল,ফ্রান্সের ট্রয়া-ফ্রেরে'র গুহাচিত্রে যে জাদুকরের ছবি পাওয়া গেছে তা প্রায় ২৫০০০ বছরেরও পুরানো। যা আমরা পেতে চাই তার যদি অনুকরণ করতে পারি বা তার সিং নখ দাঁত চামড়া ইত্যাদি অনুষঙ্গ করতে পারি তাহলে ঈপ্সিত বস্তু সহজে ধরা দেবে,এই ছিল আবহমান বিশ্বাস।
    এই বিশ্বাসের ধারা বয়ে নিয়ে চলেছে আজকের ব্রত ও আল্পনাগুলি। লক্ষ্য করলে দেখা যায় আল্পনার বিষয়বস্তু সর্বদা প্রতীকী। মরাই,চিরুনি,ধানের ছড়া,বালা,পদ্ম,সিঁদুরের কৌটো,আরো কত কি! সবই এই বোধ থেকে যে,যা কামনা করলাম তার প্রতিচ্ছবি আঁকলে কামনা পূর্ণ হবে।

    ব্রতের মন্ত্র খেয়াল করলে দেখি সেখানেও কামনার কথা সহজ ভাবে বলা
    " আমি দিই পিটুলীর বালা
    আমার যেন হয় সোনার বালা"
    এমনি আরো কত কি..
    অদৃশ্য শক্তিকে খুশি করার জন্য নাচ গান প্রার্থনা ছবি ও আরো নানান উপকরণ  ধীরে ধীরে বিবর্তিত পথে লোকসংস্কৃতির পাতায় উঠে এল। কৃষিভিত্তিক সমাজের শুরুর সাথে সাথে অর্থনীতির স্তর ভিত্তিক রূপায়ন হওয়া শুরু হয়। সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে দেখা যাবে সমাজ ও ক্ষমতার স্তর বিন্যাসে অর্থনীতি সর্বদা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে এসেছে। অর্থনীতি ও উৎপাদনগত সমৃদ্ধি পাশাপাশি হাঁটে সর্বদা। আর এই উৎপাদন ব্যবস্থার অনিবার্য ফল হল সমাজের স্পষ্ট ত্রিমাত্রিক বিভাজন।
    ১ উৎপাদনকারী
    ২.মধ্যসত্বভোগী
    ৩.উৎপাদনের ফলভোগী
    বিভিন্ন সামাজিক ধাপে বসবাসকারী মানুষজনের বিশ্বাস শোষণ শাসন ও জীবনের সাথে জুড়ে থাকা নানান অভিজ্ঞতার মিলিত ফলশ্রুতিতে
    সমাজ এগিয়ে চলে কৃষিভিত্তিক গ্রামীন সভ্যতা থেকে নগরজীবনের পথে।
    পরিশীলিত নাগরিক সংস্কৃতি আলাদা খাতে বয়ে চলে,তবু ছিন্ন হয়না আদিম যোগসূত্র, ছাপ রেখে যায় বিশ্বাসের গভীরে। আদিম বন্যজীবনের চাওয়া পাওয়া,ভয়,বিভ্রম,রহস্য তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্ম ও জাদু বিশ্বাস জড়িয়ে থাকে তার চেতনার পরতে পরতে। এগিয়ে চলল সময় ,নানান উত্থান পতনের ভিতর দিয়ে ভাঙাগড়ায় বিবর্তিত হয় সমাজ ও সভ্যতা,কিন্তু কৃষ্টি,সংস্কৃতি,লোকায়ত বিশ্বাস  অন্তঃসলিলার মত বইতে থাকে মানুষের মননে,সংস্কারে। গড়িয়ে চলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

    *সঙ্গের আঁকা ছবিদুটি শুভময় পালের সৌজন্যে